‘নদীর ওপর কোনো ব্যক্তিমালিকানা, সংস্থা বা দলের একচ্ছত্র অধিকার নেই। নদীর পানি ও মাছ–সবকিছুর মালিক জনগণ।’ উচ্চ আদালতের এমন নির্দেশনা থাকলেও রাজশাহীর চারঘাট ও পুঠিয়া উপজেলায় বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রমত্তা পদ্মার অন্যতম দুই শাখা নদী বড়াল ও নারদ এখন প্রভাবশালী মহলের গ্রাসে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নদীর মাঝখানে বাঁধ দিয়ে শুরু হয়েছে ব্যক্তিগত মাছ চাষ। এতে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে বিলীন হচ্ছে নদী দুটি।
সরেজমিন দেখা গেছে, বড়াল ও নারদ নদীর অন্তত ৩৩টি স্থানে বাঁশের চাটাই এবং মাটি ভরাট করে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এসব জায়গায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম পুকুর। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ স্থানীয় দখলদাররা এই অপকর্মে লিপ্ত। এর ফলে সাধারণ মানুষ সেচ বা গৃহস্থালি কাজে নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছেন না।
খনন হলেও সুফল নেই নারদে
নারদ নদীর তিনটি প্রবাহের মধ্যে প্রথমটি চারঘাটের শাহাপুর থেকে উৎপত্তি হয়ে নাটোরের নন্দকুজা নদীতে মিশেছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৪ কিলোমিটার নদী খনন করেছিল। লক্ষ্য ছিল ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা। বর্তমানে নদীর ২১টি পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় পানি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
পুঠিয়ার বারইপাড়া মোড়ে নদীর দুই পাশে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছেন পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক মেয়র আসাদুল ইসলাম আসাদ। পাশেই দখল করেছেন বিএনপি সমর্থক নুরে সাজি। প্রভাবশালী বছির মোল্লা নদী ভরাট করে গাছ লাগিয়েছেন। বারইপাড়া মোড়ের পূর্বপাশে চার ভাই–অমল, মলয়, বিমল ও শ্যামল নদী দখল করে মাছ চাষের জন্য লিজ দিয়েছেন। চারঘাটের বালাদিয়াড় এলাকায় আওয়ামী লীগ কর্মী রুবেল আলী এবং মৌগাছি এলাকায় মাসুম রানা, আব্দুল মালেক ও হলদিগাছী এলাকার হুমায়ুন কবির নারদ নদী দখল করে মাছ চাষ করছেন।
বড়ালেরও করুণ দশা
একসময়ের খরস্রোতা ২২০ কিলোমিটার বড়াল আজ দখলদারদের কবলে মৃতপ্রায়। নাব্য ফেরাতে ৫৫০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলেও মাঠ পর্যায়ে দখল থামছে না। চারঘাটের ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বনকিশোর এলাকায় যুবদল নেতা রাজু আহমেদ, শিমুলিয়া এলাকায় কাজিম উদ্দিন এবং রামচন্দ্রপুর এলাকায় মখলেসুর রহমান নদের ভেতরে বাঁধ দিয়েছেন। অন্তত ১২টি স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আমিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘কোটি টাকা খরচ করে খনন হলো, কিন্তু আমরা নদীতে নামতে পারছি না।’ ভুক্তভোগী আব্দুল মতিন জানান, শুষ্ক মৌসুমে টিউবওয়েলে পানি ওঠে না। এদিকে মাছ চাষের জন্য হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও রাসায়নিক ব্যবহার করায় পানি পচে দুর্গন্ধ হয়ে গেছে। জেলে মুক্তার আলী বলেন, ‘বংশপরম্পরায় নদীতে মাছ ধরছি। এখন মাছ ধরা তো দূরের কথা, দখলদারদের ভয়ে নদীতে নামতেও পারি না।’
দখল নিয়ে প্রশ্ন করলে বিএনপি নেতা আসাদুল ইসলাম আসাদ দাবি করেন, ‘আমি নদী দখল করিনি, এটা আমার কেনা সম্পত্তি।’ তবে নদী কোথায় গেল–এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি। একপর্যায়ে বলেন, বরেন্দ্র তাঁর জমিকে নদী হিসেবে দেখিয়েছে। দখলদার অমল বলেন, নিজের জমি মাছ চাষের জন্য লিজ দিয়েছি। আওয়ামী লীগ কর্মী রুবেল আলীর দাবি, কে বা কারা তাঁর নাম নিয়ে মাছ চাষ করছে জানেন না তিনি। বনকিশোর নদীতে বাঁধ দেওয়া রাজু আহমেদ বলেন, এলাকার কয়েকজন মিলে মাছ চাষ করব এমন চিন্তা করে ঘের দিয়েছিলাম। এখন আর সে ইচ্ছা নেই। একই কথা বলেন পুঠিমারী এলাকার সাইফুল ইসলাম।
বিএমডিএর সহকারী প্রকৌশলী হানিফ শিকদার বলেন, খননের উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে নদীর জায়গায় নদী ঠিকই আছে। পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক এস এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।’
রাজশাহী পাউবো উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ সরকার এবং চারঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাহাতুল করিম মিজান জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




