পানির স্তর নামছেই

বরেন্দ্র বাঁচাতে জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬,

বরেন্দ্র অঞ্চলের জলসংকট শুধুমাত্র সেখানের প্রাণপ্রকৃতির বিপর্যয় ডেকে আনছে না; লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকাকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কারণে মাটির নিচের পানিধারক স্তর বা অ্যাকুইফার মারা যাচ্ছে। ফলে বৃষ্টি ঘটলেও মাটির নিচে পানি জমছে না। এতে একদিকে যেমন সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অন্যদিকে খাওয়ার পানি সংগ্রহে মানুষকে রীতিমতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। উদ্ভূত বাস্তবতায় বরেন্দ্র অঞ্চলকে জলসংকটে প্রবণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে পানি তোলা এবং ব্যবহারে ১১টি বিধিনিষেধ প্রদান করা হয়েছিল, তবে বাস্তবে সেটা মানা হচ্ছে না। আমরা মনে করি, জরুরি ভিত্তিতে বরেন্দ্র অঞ্চলে একটি দ্রুতগতি এবং কার্যকর জল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

প্রথম আলো জনাচ্ছে, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ–এই তিন জেলার ২৫ উপজেলায় পানিসংকট দেখা দিয়েছে। এই তিন জেলার অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা হলো ৪৭ ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা, উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা হলো ৪০ ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজা, মধ্যম পানিসংকটাপন্ন এলাকা হলো ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজা। বরেন্দ্র অঞ্চলের যে ২ হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটারজুড়ে পানিসংকট তৈরি হয়েছে, সেখানে ২১ লাখ মানুষ বসবাস করছেন। এর মধ্যে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীও রয়েছেন, যাঁদের একমাত্র জীবিকা কৃষি। পানির অভাবে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কৃষি উৎপাদনসহ সেখানকার মানুষের জীবিকা ও জীবনযাপনের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

প্রাকৃতিক সংরক্ষণ না করে কেবল উৎপাদন এবং লাভ-লাভান্তরকে চিন্তা করা, এমন নীতিতে কতটা মারাত্মক এবং বহুমুখী সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, এটি পরিবর্তনের উদাহরণ হতে পারে বরেন্দ্র অঞ্চলে। ১৯৮৫-৮৬ সালে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রথম ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে সেচকাজ শুরু করে। এরপর থেকে ১৯৯৩ সালে, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এই কাজটি চালানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই তিন জেলার পানিসংকট অভিযানে, সরকারের দিক থেকে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ প্রতিষ্ঠান করা হয়েছিল। কিন্তু, নির্দেশনা মেনে ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল এবং ৪ হাজার গভীর নলকূপ প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। এই প্রমাণ প্রদান করে যে, মাটির নিচে থেকে পানি তুলতে যেমন পরিমাণ হচ্ছে, সেই পরিমাণ পানির পুনর্ভরণ করা হচ্ছে না। পানির স্তর হারানো যাচ্ছে।

পরিবেশকর্মী ও ভূতত্ত্ববিদেরা দীর্ঘদিন ধরেই বরেন্দ্রকে পানিসংকটাপন্ন অঞ্চল হিসাবে ঘোষণার দাবি করে আসছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এটিকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ রাখা, খাল, বিল, পুকুর, নদী তথা কোনো জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এবং জলাশয়গুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখাসহ ১১টি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তবে পানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত না করা গেলে দণ্ডনীয় হলেও জনগণের পক্ষে এমন বিধিনিষেধ মানাটা দুরূহ। সে ক্ষেত্রে খাঁড়ি ও পুকুরগুলো খনন ও পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি ধারণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সেখানে পানি কম প্রয়োজন হয়, এমন ফসল ও শস্য উৎপাদনে কৃষককে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।

বরেন্দ্র অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানিসংকটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা ‘ওয়াটার লর্ডশিপ’ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এ ব্যবস্থাটি ভাঙাটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বিএমডিএকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।আমরা মনে করি, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে বরেন্দ্র অঞ্চলকে আরও মরুকরণ ও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না। সরকারের একটি টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে বরেন্দ্র বাঁচাতে সহায়ক হতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top