আমন ঘরে তোলার পর শুষ্ক মৌসুমে বোরো চাষের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কৃষকরা। কোথাও চলছে হালচাষ, কোথাও রোপণ হচ্ছে সবুজ চারা। কিন্তু সেই তরতাজা তিন ফসলি জমির পাশেই মাটি ভরাট করে উঠছে বহুতল ভবন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার-ভানুগাছ সড়কসহ জেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে এখন এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের কারণে গত পাঁচ বছরে জেলায় প্রায় ৭০০ একর কৃষিজমি হারিয়ে গেছে।
মৌলভীবাজারে গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপকভাবে কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে উঠছে বিভিন্ন স্থাপনা। সময় যত যাচ্ছে ততই দৃশ্যমান পাকা ভবনের সংখ্যা বাড়ছে। গত ৫ বছরে জেলায় প্রায় ৭০০ একর কৃষি জমি কমেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে ফসিল জমি ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে গড়ে তোলা স্থাপনার জন্য গ্রামীণ সড়কের পাশেও জমি ভরাট করে নির্মাণ কাজ চলছে। এসব স্থাপনা নির্মানের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভার কাছে অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কেউ এসব পরোয়া করেন না। এছাড়া কেউ পাত্তাই দিচ্ছেন না ভূমি সুরক্ষা আইন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেলার সাতটি উপজেলাসহ হাকালুকি, হাইল, কাউয়াদিঘী হাওরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষি জমি ভরাটের মহোৎসব চলছে। কয়েক বছর আগেও যেসব জমিতে তিন ফসল হতো, সেসব এখন ভরাট হয়ে গেছে। এসব জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বসতঘর, দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এতে করে একদিকে কমছে ফসিল জমি অন্যদিকে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের।
এছাড়া অনেক জমির মালিক অল্প কিছু টাকার জন্য জমির ওপরের স্তরের মাটি কেটে বিক্রি করছেন বিভিন্ন ইটভাটার মালিকের কাছে। এতে করে জমির উর্বরতা শক্তি যেমন কমছে, অন্যদিকে এই মাটি দিয়ে কৃষিজমিতে ভিটা ভরাট করা হচ্ছে। ফলে দুদিক থেকেই ফসল উৎপাদনে ক্ষতি হচ্ছে।
ভূমি ব্যবহার ও সেচ পরিসংখ্যান জরিপ সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে ২০১৯ সালে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০০ একর কৃষি জমি কমেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে ফসিল জমি ভরাট করে বাড়িঘর, দোকানপাট নির্মান ও জমি ভরাট করে ফেলে রাখা হয়েছে।
কৃষি জমিতে নানা স্থাপনা গড়ে তোলা ব্যক্তিরা জানান, যাঁরাই ফসলের জমি ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করছে তাদের প্রয়োজনে করছে। এখন জমিতে কৃষি চাষ করে লাভ হয়না। এরচেয়ে জমি ভরাট করে দোকান বা বাসাবাড়ি নির্মাণ করলে একদিকে জমির দাম বারে অন্যদিকে এরথেকে ভাড়া পাওয়া যায়। এছাড়া অনেকের আগে পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম ছিল, যা এখন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য অনেকেই নতুন বাড়িঘর নির্মাণ করছেন।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নূরুল মুহাইমিন মিল্টন বলেন, কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন থাকলেও এর কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই আমাদের দেশে। এই আইন অল্প পরিসরে বাস্তবায়ন হলেও কিছুটা কৃষিজমি রক্ষা করা যেত। যেভাবে জমি ভরাট করা হচ্ছে, তাতে করে একসময় খাদ্যের অভাব দেখা দিতে পারে। সময় যথ যাচ্ছো কৃষি জমি ভরাটের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে যার ইচ্ছে মতো এই কাজ করছে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বা যেকোনো জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন বা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমতি নিতে হবে। সড়কের পাশে বাড়িঘর নির্মাণ করা হলে অবশ্যই জায়গা রেখে স্থাপনা তৈরি করতে হবে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, কৃষি জমি ভরাট করলেও খাদ্য উৎপাদনে তেমন প্রভাব পড়বে না। কারণ এখন উচ্চ ফলনশীল অনেক ধানের জাত আছে।
তিনি আরও বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কৃষি জমি ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। অনেকের পরিবার বড় হয়েছে এজন্য নতুন করে ঘরবাড়ি নির্মাণের প্রয়োজন হচ্ছে। আমাদের সবাইকে মিলে কৃষিজমি রক্ষা করে স্থাপনা তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশে কৃষি জমি ভরাটের বিষয়ে আইন হলো স্থাপনা নির্মাণের আগে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। তবে এই আইন কেউ মানতে চান না।




