স্কুলের সহকর্মীদের মধ্যে যার সঙ্গে আমার কথাবার্তা বেশি হতো না, তার একদিন ট্রেনিং ক্লাসে আমার কাছে প্রশ্নের প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল। আমার আলোচনার বিষয় ছিল আনা ফ্রাঙ্ক। ইতিহাসের এক কিশোরীর ডায়েরি যেন আমাদের মধ্যেও একটি গোপন দরজা খুলে দিয়েছিল। প্রশ্ন থেকে আলোচনা, আলোচনা থেকে সংবাদ, সম্পর্কের সূচনা ঠিক কবে হলো, তা আমি নির্দিষ্ট করতে পারতাম না।এরই মধ্যে আমার অন্য কোনো জায়গায় চাকরি হয়ে গেল। বিদায়ের দিন সে আমাকে ব্যবহারিক উপহার দিল আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি, একগুচ্ছ রজনীগন্ধা আর একটি ছোট চিরকুট। সেখানে প্রথমবার আমি একটি নতুন নামে পরিচিত হলাম ‘হাসি মিস’।সন্ধ্যায় ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলাম। পরদিন সে লিখল, স্কুলের ভিড়ে আমার হাসিটা নাকি আলাদা করে দেখা যাচ্ছে—তাই এই নাম। এর পরে ছিল স্কুলের পিকনিক, যেতে না পেরে মনটা অকারণে ভারী হয়ে ছিল। বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপে এল আরেকটি বার্তা, এত মানুষের মাঝেও নাকি আজ একটা হাসি অনুপস্থিত—’মিসিউ হাসি মিস’।সেখান থেকেই আমরা হয়ে উঠলাম ডিজিটাল চিঠিবন্ধু। শব্দের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে অনুভূতি ঘন হতে লাগল। প্রেম প্রকাশের আগেই চিঠির বাইরেও আমরা দুজন দুজনকে মন মন লিখতাম অনেক কিছুই—সেই দুই ‘মন’ এক করে আমি তার নাম দিলাম ‘মন্টু’। আর দুজনের নামের আদ্যক্ষর মিলিয়ে নিজেদের বলতাম, ‘সাহাপ্যাথি’; কারণ আমাদের বোঝাপড়া কখনো কখনো ভাষাকেও অতিক্রম করত। অভিধানের ভাষায় যা টেলিপ্যাথি।তার পরে প্রেমের পর প্রথম দেখা ৩ জুন। সেই দিনের নাম দিয়েছিল ‘মহাদৃষ্টি’। এরপর থেকে শুক্রবারটা যেন আমাদের জন্যই নির্ধারিত ছিল। ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক, যত ব্যস্ততাই থাকুক—আমরা দেখা করতামই।তবু এত রোমাঞ্চকর মুহূর্তের মধ্যেও একটা অদৃশ্য দেয়াল ছিল। চোখে দেখা যায় না, অথচ অতিক্রমও করা যায় না। তুমি হয়তো সেই দেয়াল টপকে আমার কাছে এসেও বারবার ফিরে গেছ।দেয়ালের দুই পাশে দাঁড়িয়ে এখন আমরা দুজন। এপাশে দাঁড়িয়ে আমার ভেতরটা যেমন লাল-নীল হয়ে ওঠে, ওপারে দাঁড়িয়ে তোমারও কি এমন হয়? ‘হাসি’ নামটা এখনো আমার ভেতরে বেঁচে আছে, যেমন বেঁচে আছে ‘মন্টু’ নামটা, আর সাহাপ্যাথির সেই গোপন অভিধান।



