হারবাল উদ্যোক্তা থেকে ইয়াবা মিনিল্যাবের মালিক

এক সময় ডাইস ব্যবহার করে হারবাল ট্যাবলেট তৈরি করতেন ৩২ বছর বয়সী তৌহিদুজ্জামান ওরফে শিমুল। স্থানীয়ভাবে নিজেকে হারবাল ব্যবসায়ী ও কেমিস্ট হিসেবেই পরিচয় দিতেন তিনি। পরে বদলে যায় পেশার ধরন। স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফার আশায় অবৈধ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন তিনি। গাজীপুরের টঙ্গীর বাসায় গোপনে গড়ে তোলেন ইয়াবা তৈরির একটি ‘মিনিল্যাব’। হারবাল ট্যাবলেট তৈরিতে ব্যবহৃত ডাইস ও ট্যাবলেট প্রেস মেশিনকেই কাজে লাগানো হতো ইয়াবা তৈরিতে। বাজার থেকে সংগ্রহ করা রঙ, ফ্লেভার, স্টার্চজাত আঠালো উপাদান ও ক্যাফেইনসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরি করা হতো ট্যাবলেট। পরে বিশেষ ছাঁচে চাপ দিয়ে সেগুলোকে ইয়াবার আকার দেওয়া হতো।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বল্প খরচে উপকরণ সংগ্রহ করে অধিক লাভে বাজারজাত করাই ছিল তৌহিদুজ্জামানের মূল উদ্দেশ্য। তৈরি করা ইয়াবা ছিল ভেজালযুক্ত। তৌহিদুজ্জামান কারাবারিদের কাছ থেকে পাঁচশ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট সংগ্রহ করে সেগুলো পাউডার করেন। এরপর দোকান থেকে কেনা ফ্লেভার, ইয়াবার রঙ, স্টার্চজাত আঠালো উপাদান ও ক্যাফেইনসহ বিভিন্ন উপকরণ ওই পাউডারের সঙ্গে মেশাতেন। এরপর ডাইসের মাধ্যমে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা তৈরি করতেন। অর্থাৎ মূল উপাদানকে ভেজাল মিশিয়ে দশগুণের মতো বাড়িয়ে বাজারজাত করা হচ্ছিল। এভাবেই প্রায় প্রতিদিন তিনি পাঁচ পিস ইয়াবা থেকে নিজের ল্যাবে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবা তৈরি করতেন। ঢাকাসহ গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় তার তৈরি ট্যাবলেট সরবরাহ করা হতো। স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ হওয়ায় সন্দেহ এড়াতে সক্ষম হন দীর্ঘ সময়।

তবে শেষ রক্ষা হয়নি তৌহিদুজ্জামানের। তার ইয়াবা তৈরির ‘মিনিল্যাব’ এর সন্ধান পেয়ে যায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর বসুন্ধরা কাজীবাড়ী পুকুরপাড় এলাকার তৌহিদুজ্জামানের বাসায় অভিযান চালায়। সেখানে ট্যাবলেট তৈরির ডাইস, কাঁচামাল, রঙ, ফ্লেভার, স্টার্চ, ক্যাফেইন ও সাড়ে চার হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় তৌহিদুজ্জামানকে। প্রায় চার মাস ধরে তিনি নিজ বাসাতেই মিনিল্যাব বসিয়ে ইয়াবা তৈরি ও সরবরাহ করছিলেন। এ ঘটনায় ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিদর্শক আবু নাসের বাদী হয়ে টঙ্গী পূর্ব থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। শুক্রবার তৌহিদুজ্জামানকে গাজীপুরের আদালতে হাজির হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনি থানার পাইথালী এলাকায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, তৌহিদুজ্জামানের ল্যাবে তৈরি ট্যাবলেটে মাদকের মাত্রা অনির্দিষ্ট থাকে, কখনও অতিরিক্ত উত্তেজক, কখনও আবার কার্যকারিতা কম। এতে ব্যবহারকারীদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে। অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ক্যাফেইন ও অন্যান্য রাসায়নিক মিশ্রণে হৃদ্‌যন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। যে মেশিনে ইয়াবা তৈরি করা হচ্ছিল, সেটি দিয়ে আগে হারবাল ট্যাবলেট বানানো হতো। হারবাল ব্যবসা ছেড়ে তৌহিদুজ্জামান মাদক তৈরিতে জড়িয়ে পড়েন। নিজেও ইয়াবা সেবন করতেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, চাহিদা কমানো ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভাঙতে একযোগে অভিযান, নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। স্বল্প উপকরণ আর প্রযুক্তি ব্যবহারে স্থানীয় পর্যায়েই তৌহিদুজ্জামান মাদক উৎপাদন করে আসছিলেন। 

এর আগে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রাজধানীর ওয়ারীতে মাদক ‘কুশ’র একটি ল্যাবরেটরির সন্ধান পায় ডিএনসি। বিপুল পরিমাণ মাদক ও উৎপাদন উপকরণ জব্দ করা হয়। সেখান থেকে বাসার তত্ত্বাবধায়ক রাজু শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই বাসায় বিশেষ পদ্ধতিতে ল্যাবে কুশ উৎপাদন করা হতো। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ধানমন্ডির জিগাতলায় ক্রিস্টাল মেথের (আইস) ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়।

ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, ছোট আকারের ‘মিনিল্যাব’ খুঁজে বের করা বড় চ্যালেঞ্জ। ডিএনসির মহাপরিচালকের নির্দেশে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকায় টঙ্গীর এই ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়। এই চক্রের সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছে কিনা, সরবরাহ নেটওয়ার্ক কোথায় বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top