মবের ট্রমা : সরকারের ভয়-তাড়ানিয়া বার্তায় স্বস্তি

প্রথম কার্যদিবসেই মবের বিরুদ্ধে নতুন সরকারের কঠোর বার্তা অগ্রসর চিন্তার সব মানুষকে আশাবাদী করেছে। খুব দরকার ছিল মব বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানানো। গেল সরকার আমলে সব মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল মব কালচার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, দেশে কোনোভাবেই মব কালচার সহ্য করা হবে না।


দাবি আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর বা জনদুর্ভোগ তৈরি করলে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনোক্রমেই মব হতে দেওয়া হবে না। তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে কঠোর হাতে। প্রসঙ্গক্রমে বলেন, একটি বড় ঝড় বয়ে গেছে।
একটি বিপ্লব হয়েছে, বিদ্রোহ হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে না, তবে মব নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
মব এবং ভয় বিষয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন নবনিযুক্ত তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও। দেশে একটি ভয়মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবেশ তৈরির আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, তিনি জানেন, ভয়ের মধ্যে বসবাস কত কষ্ট-যন্ত্রণার! মব বিষয়ে সরকার অনুভূতি, বিশেষ করে পেশাদার খেটে খাওয়া যে গণমাধ্যমকর্মীরা এখনো মব তাড়নায় বা ট্রমায় ভুগছেন, সরকার চাইলে তাঁদের যাতনার তথ্য শেয়ার করতে পারে।


তথ্যমন্ত্রী হতে পারেন এর শরিকজন। উদাহরণ হিসেবে নিতে পারেন দফায় দফায় মবের শিকার হওয়া কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলীর মবে পড়ার কষ্টকর সেই দিনলিপি। জানার চেষ্টা হতে পারে মবতন্ত্র শেষে গণতন্ত্রের কী তফাত? বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারার আকাঙ্ক্ষিত কাব্য। মব তাড়ানোর অপেক্ষায় মাথা ঠুকে মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার কষ্ট তাঁর মতো ভুক্তভোগীরাই জানেন হাড়ে হাড়ে। 
বিগত ১৭ বছরে দুর্নীতি-লুটপাট ও মাফিয়াতন্ত্রের একেকটি চাঞ্চল্যকর ও দুঃসাহসী প্রতিবেদন রচনা করেছেন হায়দার আলী।


জীবন হাতে নিয়ে পেশাগত কাজের অংশ হিসেবে সাবেক প্রতাপশালী আইজিপি বেনজীর ও আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমসহ অর্ধশতাধিক এমপি-মন্ত্রীর অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য বের করে এনেছিলেন তিনি। তখনকার বাস্তবতায় তা কল্পনাকেও হার মানায়। এর জেরে ১১টি হামলার আসামি হতে হয় তাঁকে। মাসের পর মাস দৌড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলার আদালতের বারান্দায়। তবে মবে পড়তে হয়নি। ফ্যাসিস্ট-পরবর্তী ইন্টেরিম রেজিমে তাঁর নসিবে জুটেছে মব নাশকতা। দফায় দফায় অন্তত তিনবার মবের জমের শিকারের পাশাপাশি চলে মিথ্যা মামলাও। মাঝেমধ্যে কর্মস্থলেও ঢুকে পড়েছে মববাজরা। মব যখন যে আমলেই হোক, এটি ক্রিমিনাল অফেন্স। তাই সদ্য শপথ নেওয়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে যখন ‘মবের দিন শেষ’ মর্মে বার্তা এসেছে, তা শান্তিকামী সব মানুষকেই আশাবাদী করেছে।
উচ্ছৃঙ্খল কিছুসংখ্যকের অতিশয় সংঘবদ্ধ আক্রমণকে মব জাস্টিস বা মব কালচার নাম দেওয়া হয়েছে। আসলে এটি মোটেই কোনো জাস্টিস বা কালচার হতে পারে না। নোবেল লরিয়েট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে চব্বিশের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রার শুরুতে মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এক নবযুগের সূচনা হলো বলে। অন্তত ব্যবসা-বিনিয়োগসহ অর্থ সেক্টরে একটা স্পন্দন জাগবে বলে ধারণা হয় অনেকের। ড. ইউনূস নিজে দেশসেরা অর্থনীতিক। তাঁর পরিষদে ছিলেন ড. ওয়াহিদউদ্দিন, ড. সালেহউদ্দিনের মতো অর্থনীতিকরা। কিন্তু আদতে দেখা গেল বাস্তবতা বিপরীত। দিল্লি হনুজ দূর-অস্ত্। ব্যবসা-বিনিয়োগ যা ছিল, জ্ঞানী-গুণীদের অন্তর্বর্তী সরকার আমলে তাতে আরো আকাল ভর করে। চেপে বসে মবের যম, যার অনিবার্য পরিণতিতে পড়ে গোটা অর্থনীতি। মাঝেমধ্যে জিডিপি আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড়াই হাজির করা হলেও ভেতরগত অবস্থা কাহিল করে দেওয়া হয়।

পৃথিবীর সব দেশেই সব বিনিয়োগকারী মুনাফা ও কম্পানির প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়েই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। সেই সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তা রূপ নেয় আরো ভয়াবহতায়। বাংলাদেশ এর চরম শিকার ও উদাহরণ, যার জেরে ব্যবসা-বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শ্রমিকের কাজ, মজুরি, নিরাপত্তা, কৃষকের ফসল, কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণের দাম, জননিরাপত্তা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু, শিশু, নারী, বৃদ্ধ—সবখানেই ভঙ্গুর দশা। সমাজের অস্থিরতা বৈষম্যও বাড়িয়ে তোলে। অর্থনীতির দুর্গতি কেবল সাধারণ মানুষ নয়, দুর্ভাবনায় ফেলে সব মানুষকেই। সাধারণ মানুষ, চাকরিজীবী আর ব্যবসায়ী-শিল্পপতি কেউই স্বস্তি পাননি। ব্যবসা-বিনিয়োগে স্থবিরতা, ঋণপ্রবাহ হ্রাস এবং আমদানি-রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীরা সয়েছেন টানা প্রায় দেড় বছর। বাংলাদেশের ইতিহাসই যথেষ্ট, যেখানে অভ্যুত্থান, বিশ্ব আর্থিক বিপর্যয় ও মহামারি—সবই রয়েছে, কিন্তু কখনো বিনিয়োগের এতটা পতন ঘটেনি, যা ইন্টেরিমের রেজিমে ঘটেছে।

বিশ্বায়নে কোনো দেশে আইনের শাসন ও স্বচ্ছতা থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা পান। বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। একটি গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল হয়, যা রপ্তানি, রেমিট্যান্স এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। চাহিদার দিক থেকে ভোগ, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় ও বহির্বাণিজ্যের নেট প্রাপ্তি একটি জাতির অর্থনীতির মোট উৎপাদন নির্ধারণ করে। ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা এর একটি নতুন বাতাবরণ চেয়েছেন। কারণ তাঁদের টিকে থাকতে হয় ঘামে-শ্রমে-উৎপাদনে। সেই সঙ্গে নিয়োগ করা জনবলের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে। ব্যথা-বেদনায়ও কাঁদতে পারেন না। সক্ষমতা দেখাতে হয়। 

নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁরাসহ দেশের সব পেশা ও শ্রেণি এখন সেই বাতাবরণের সাফল্যপ্রত্যাশী। একটি সরকার ব্যবসার জন্য কতটা ভালো পরিবেশ দিতে পারে এবং ওই রাষ্ট্রে কার্যকর চাহিদা কতটা শক্তিশালী, তার ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগের ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াবে। তাই বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে একটি সরকারের সক্ষমতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও কৃতিত্বের মাপক হিসেবে ধরা হয়। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বড় প্রাসঙ্গিক। এর ওপর মবের মতো দানবীয়তা রুখতে না পারলে সামনে এগোনোর আশা কেবল দুরূহ নয়, যেটুকু আছে, তা-ও ঝুঁকিতে পড়বে। ধারণা করা যায়, নতুন সরকারের শীর্ষ মহল তা অনুধাবন করছে বলেই সুনির্দিষ্টভাবে ‘মব’ বিষয়ে তাদের মনোভাব স্পষ্ট করেছে। বাকিটা অপেক্ষার বিষয়। মবের দমন না হলে অভ্যন্তরীণ বা ব্যক্তি বিনিয়োগও বাড়বে না। আর বিদেশি বিনিয়োগ তো আরো পরের ব্যাপার। কেবল বিনিয়োগ নয়, অন্যান্য পেশাদারিও টিকবে না, তৈরিও হবে না।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top