সরকারি দফতরে লালফিতার দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি চাইলেন ব্যবসায়ীরা

বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে অন্যতম হলো প্রশাসনিক জটিলতা। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে লালফিতার প্রভাবের ফলে ব্যবসায়ীরা হয়রানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে একটি বৈঠকে এসব মন্তব্য করেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাদের জবাবে জানান, ক্ষমতার আসনে গেলে দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য রক্ষক হিসেবে কাজ করবেন।

রাজধানীর হোটেল শেরাটনে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, যদি তারা সরকার গঠন করে তবে লালফিতার প্রভাব বন্ধ করে ঘুষ এবং চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করবেন। তিনি উল্লেখ করেন, জনগণ যদি ভোট দিয়ে তাদের সমর্থন করেন তবে এই সম্মানের গুরুত্ব বজায় রাখা হবে। ঘুষ, চাঁদাবাজি এবং লালফিতার প্রভাব বন্ধ করা হবে।

‘সমৃদ্ধির সংলাপ: বাংলাদেশের শিল্প এবং বাণিজ্যের জন্য কৌশলগত চিন্তা’ শিরোনামের এই সেমিনারে অংশ নেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, এ কে আজাদ এবং মো. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, বারভিডার সভাপতি আবদুল হকসহ অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। সভায় ‘বাংলাদেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম।

সভা শুরুর প্রথমেই জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, তাদের দল দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে লালফিতা আর থাকবে না। লালফিটাকে কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘স্পিড মানি’ নামে ঘুষের সংস্কৃতি শিল্প ক্ষেত্রকে প্রথম আঘাত করে। শিল্পোদ্যোক্তারা ঘুষের ফলে ব্যবসায়ে নানা সমস্যায় পড়েন। চাঁদাবাজেরা ব্যবসায়ীদের রাতের নিদ্রা নষ্ট করে। নির্ধারিত সময়ে কারখানা চালু না হলে ব্যাংক ঋণের সুদও চলতে থাকে। এই কারণে উদ্যোক্তারা শুরু থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই পরিস্থিতিকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করতে হবে।

জামায়াতের আমির বলেন, ঘুষের কারণে দেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যায়, যদিও তাদের কাছে ইচ্ছা ও সম্পদ রয়েছে। যদি দেশি বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, তবে কেন বিদেশি বিনিয়োগ আসবে— এ প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে আগে খুঁজে বের করতে হবে।

শফিকুর রহমান দাবি করেন, অবৈধভাবে বিদেশে চলে যাওয়া অর্থকে সম্মানের সাথে দেশে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হবে। এটি কাউকে অপমান করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং জাতির উন্নতির জন্য। যাঁরা অর্থ ফেরত দেবেন, রাষ্ট্র তাঁদের সম্মান দেবেন।

ফান্ডের নিরাপত্তাহীনতা, সম্পদের সুরক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় সমর্থনের অভাবশব্দকে জামায়াতের আমির শিল্প মালিকদের প্রধান তিনটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরসহ দলের অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন। নতুন সরকারি গঠন হলে সরকার এবং বেসরকারি খাত উভয়কে একত্রে কাজ করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত গত দেড় বছরে সরকার বেসরকারি খাত থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। এই দূরত্ব বজায় থাকলে দেশি বা বিদেশি কোনো বিনিয়োগও টেকসইভাবে আসবে না। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল সহমর্মিতার পরিবেশে একটি সমন্বিতভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি দেশের আইন ও শৃঙ্খলার প্রতি সতর্ক থাকবে। কোনো অবস্থায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না।’
জামায়াত নেতাদের উদ্দেশ্যে এফবিসিসিআইয়ের প্রাক্তন সভাপতি এ কে আজাদ উল্লেখ করেন, ‘আপনারা হয় সরকারের অংশ হবেন, অথবা বিরোধী দলে থাকবেন। মধ্যবর্তী কোনো পজিশন নেই, এটা নিশ্চিত। রাতফিতার বিষয়টি অনেকেই জেনেছে। আমার মতে, রাতফিতা আসলে কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। যদি সরকার সত্যিই চায়, তাহলে রাতফিতা তাদের পদে থাকবে।’

এ কে আজাদ জানান, ‘বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। এর জন্য ব্যবসায়ীরা এবং সরকার উভয়ฝ่ายের দায় রয়েছে। কারণ, অর্থ বিদেশে চলে গেছে। যারা অর্থ পাচার করে দেশের সম্পদ বিদেশে নিয়ে গিয়েছে, তাদের অবশ্যই শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্রতিশ্রুতি আপনাদের কাছ থেকে চাই।’

এফবিসিসিআইয়ের অন্য একজন প্রাক্তন সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, একটি পোশাক বা উৎপাদন শিল্প স্থাপনের জন্য যেখানে একটিমাত্র নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি লাইনই যথেষ্ট, সেখানেও উদ্যোক্তাদের একাধিক বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে যে বিনিয়োগ সরাসরি উৎপাদনে আসার কথা ছিল, তার একটি বড় অংশ ইউটিলিটি ব্যবস্থাপনায় খরচ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যেখানে একটি কারখানায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা ছিল, সেখানে ইউটিলিটি নিশ্চিত করতে গিয়েই ব্যয় হচ্ছে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই বিপুল অর্থের বৃহৎ অংশ আসে ব্যাংক ঋণ থেকে, ফলে সুদের চাপ বাড়ে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং পরিণামে শিল্পটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘রেড টেপ বা রাতফিতা—এ বিষয়ে আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই। রাতফিতা শুধু সমস্যা নয়, এটি এতটাই ভারী হয়ে গেছে যে এটি কাটার জন্য সাধারণ একটি কাঁচি দিয়ে হবে না—বড় কাঁচির প্রয়োজন রয়েছে।’

আমলাতন্ত্র আজ বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এই আমলাতন্ত্র এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে যে তারা প্রকৃতপক্ষে রেগুলেটর নয়—তারা রাজা এবং আমরা প্রজা। তহসিলদার থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত এই মনোভাব বিস্তৃত। আমাদের রয়েছে সম্পদ, জনগণ, উদ্যোক্তারা অত্যন্ত উদ্যমী ও আগ্রহী। সমস্যা একটাই—আমাদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এজন্য আল্লাহর দরবারে অনুরোধ করছি, যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের উচিত আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা, আইন-কানুনকে সহজ এবং সংক্ষিপ্ত করা, এবং পারমিশনের জট কমানো।’

ব্যবসায়ীদের যাতায়াত ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক। আমরা যেখানে চাই যেতে পারি, কথা ব্যাক্তি করতে পারি, মত প্রকাশ করতে পারি। তবে কেন আমি কোথায় যাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি না—এই প্রশ্নের কারণে আমাকে প্রশ্নবাণে আক্রান্ত হতে হয়, এই চিন্তা কাজ করে। এটি কোনো স্বাধীনতার লক্ষণ হতে পারে না। আমাকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। এই সুযোগ, এই স্বাধীনতা, এই নিরাপত্তা—আমরা আমাদের সকল রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করি। ব্যবসা করতে চাইলে আগে এই আরামদায়ক অনুভব, সুরক্ষা এবং সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।’

নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রাক্তন সভাপতি ফজলুল হক বলেন, দেশে সরকারি সহায়তা রয়েছে, কিন্তু এটি প্রায় সব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক; প্রতিযোগিতামূলক নয়। যদি সত্যিই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ‘রেড টেপ’ ভাঙা যায়, তবে কেবল গার্মেন্টস খাত নয়, পুরো শিল্প খাত অনেকদূর এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ড্রাগ ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মোহাম্মদ জাকির হোসেন মন্তব্য করেছেন, ব্যবসায়ীদের জনগণের প্রতিযোগী নয়, বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। নীতিমালা তৈরিতে ব্যবসায়ীদের involvement জরুরি। ওষুধ খাতে ব্যবসা চালানোর জন্য ৪৭ ধরনের লাইসেন্স এবং নিয়মিত নবায়ন একটি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি এবং হয়রানির ফলে উদ্যোক্তাদের ক্ষতি হচ্ছে।

আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শেখ মহিউদ্দিন বলেছেন, ‘ব্যবসায়ীদের কোনো রাজনৈতিক দল নেই, তারা শুধু নিরাপদ পরিবেশের খোঁজে। যে দল ক্ষমতায় থাকবে, রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, তাদের কাছে আমাদের একটাই দাবি, আমাদের কোনো উপকারের প্রয়োজন নেই; শুধু ক্ষতি যেন না হয়।’

মেট্রোপলিটন চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখন পরিবর্তনের এক নতুন সময়ে প্রবেশ করছে। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক গঠনতন্ত্রে মৌলিক পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারকদের কাছে আবেদন থাকবে, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রটিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য করুন। এই খাতের সম্ভাবনাগুলোকে রাষ্ট্রীয় নীতিমালায়, উন্নয়ন ধারণায় এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে অন্তর্ভুক্ত করবেন।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের লাখ লাখ সৎ ব্যবসায়ীকে ‘অলিগার্ক’ বা অর্থ পাচারকারী হিসেবে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা অন্যায়। যেসব ব্যক্তির পরিবার বিদেশে এবং সম্পদ দেশের বাইরেও রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

1 thought on “সরকারি দফতরে লালফিতার দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি চাইলেন ব্যবসায়ীরা”

  1. HM HASAN MAHMUD HIMU

    বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। সরকারি দফতরে লালফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে ব্যবসায়ীরা হয়রানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। জবাবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য পাহারাদারের ভূমিকা পালন করবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top