ধ্বংসস্তূপেই এলো আরও এক করুণ রমজান

টানা দুই বছরের ধ্বংসলীলা আর লাশের পাহাড় মাড়িয়ে ফিলিস্তিনের গাজায় আবারও ফিরে এসেছে পবিত্র রমজান মাস। তবে এবারের রমজান গাজাবাসীর জন্য কোনো উৎসবের বার্তা নিয়ে আসেনি, বরং বয়ে এনেছে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের শূন্যতা আর বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ আর বোমাবর্ষণের আতঙ্কের মধ্যেই গাজার প্রতিটি ঘরে এখন কান্নার রোল। যে শহর একসময় রমজানের আলোকসজ্জায় ঝলমল করত, আজ সেখানে কেবল বারুদ আর ধ্বংসের গন্ধ।

উত্তর গাজা সিটির তরুণ আমজাদ জুদাহর জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি ছিল তার বাবা আর ভাইদের সঙ্গে হাত ধরে মসজিদে গিয়ে তারাবি পড়া। ২৫ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী আজ তার আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির এক কোণে বসে সেইসব দিনগুলোর কথা ভাবছেন। ইসরায়েলি বিমান হামলায় আমজাদ তার বাবা-মা এবং চার ছোট ভাইবোনকে হারিয়েছেন। এখন তিনি একা, তার চারপাশের দেয়ালগুলো স্প্লিন্টারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। সেই স্মৃতিগুলোই এখন তার একমাত্র সঙ্গী।

গাজার প্রতিটি ইফতারের টেবিল এখন অপূর্ণ। আমজাদ জানান, অতীতে তার মা এবং বোন সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা আগে থেকে খাবার তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন, আর বাবা রেডিওতে কুরআন তেলাওয়াত ছেড়ে দিতেন। ভাইদের মধ্যে মিষ্টির থালা নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যেত। কিন্তু এই রমজানে তিনি সম্পূর্ণ একা একটি ইফতারের টেবিল সাজিয়ে বসেন, যেখানে নেই কোনো কোলাহল। তারাবি পড়তে এখন তিনি একাই মসজিদে যান, কারণ তার পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই।

গাজার অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ এখন কেবলই ধ্বংসস্তূপ। ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার বোমা হামলায় গুঁড়িয়ে গেছে ইবাদতের পবিত্র স্থানগুলো। যারা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জামাতে নামাজ পড়তেন, তাদের অনেকেই আজ কবরে অথবা হাসপাতালের শয্যায়। ক্রমাগত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ফলে মানুষ এখন জনসমাগম এড়িয়ে চলছে। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া বা সামাজিকভাবে ইফতার করার প্রথা এখন নিরাপত্তার অভাবে বিলীন হয়ে গেছে।

গাজা সিটির উপকূলীয় এলাকায় একটি তাবু খাটিয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন ৪১ বছর বয়সী সানা আল-শারবাসে। তার স্বামী যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে এখন কর্মহীন। মাসে যেখানে তারা ৮০০ ডলার আয় করতেন, এখন সেখানে মাত্র ২০০ ডলারের মানবিক সহায়তায় তাদের চলতে হচ্ছে। চড়া দামের কারণে এবার তিনি তার সন্তানদের জন্য কোনো রমজানের লণ্ঠন বা সাজসজ্জার সরঞ্জাম কিনতে পারেননি। লণ্ঠনের বদলে তিনি হাতে তৈরি কাগজের মালা দিয়ে তাবুর মুখ সাজিয়েছেন।

সানার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন বায়না ধরে লণ্ঠন কেনার জন্য, তখন তিনি তাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে কিনে দেব’। কিন্তু সানা মনে মনে জানেন যে, সেই আগামী সপ্তাহ হয়তো আর কোনোদিন আসবে না। কারণ গাজায় এখন সাজসজ্জার জিনিসের দাম পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে। উৎসবের আমেজ তো দূরের কথা, দুবেলা খেয়ে বেঁচে থাকাই এখন এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজার ঐতিহ্য অনুযায়ী রমজানের প্রথম দিনে প্রায় প্রতিটি ঘরে চিকেন আর মোলোখিয়া রান্না হতো। কিন্তু সানার মতো হাজারো মায়ের কাছে সেই ঐতিহ্য এখন বিলাসিতা। ত্রাণের সামান্য খাবার আর ওষুধ কিনতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

যে শিশুটির হাতে লণ্ঠন থাকার কথা ছিল, সে এখন ক্ষুধার্ত চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, এই বুঝি আবার কোনো যুদ্ধবিমান ধেয়ে আসে। রমজানের এই পবিত্র মাসেও গাজার আকাশে শান্তির বদলে বারুদের ধোঁয়া উড়ছে।

গাজাবাসীর কাছে এখন রমজান পালন করা মানে কেবল রোজা রাখা নয় বরং প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক সংগ্রাম। প্রিয়জনদের কবর আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তারা প্রার্থনা করছেন মুক্তির জন্য। প্রতিটি ইফতারের সময় তারা আল্লাহর কাছে কেবল একটিই আর্জি জানাচ্ছেন, যেন এই গণহত্যার অবসান ঘটে। দীর্ঘ দুই বছরের বঞ্চনা আর শোকের সাগর পেরিয়ে ফিলিস্তিনিরা আজও আশায় বুক বেঁধে আছেন, কোনো একদিন হয়তো আবার তারা শান্তিতে তারাবি আর ইফতারের আনন্দে মেতে উঠতে পারবেন।

সূত্র: টিআরটি

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top