মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের পার্শ্ব বৈঠকে সম্প্রতি ইরানি বিরোধী দলীয় নেতা রেজা পাহলভির দেওয়া একটি বক্তব্য বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেখানে তিনি কেবল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমালোচনাই করেননি বরং ইরানের ভেতরে সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। পাহলভি তার বক্তব্যে এই যুদ্ধকে একটি মানবিকতার সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করেন, আমেরিকার আক্রমণ বর্তমান সরকারকে দুর্বল করবে বা এর পতনকে ত্বরান্বিত করবে। এমনকি তিনি একে মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি উপায় হিসেবেও উল্লেখ করেন। তবে তার এই প্রস্তাবকে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ও নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যখন কোনো বিরোধী ব্যক্তিত্ব নিজ দেশের ওপর বিদেশি শক্তির হামলার ওকালতি করেন, তখন তিনি সাধারণ ইরানিদের স্বার্থ রক্ষার নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করেন।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তি বা গণতন্ত্র আনার এই প্রচারণা অতীতেও চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ৯/১১ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন বিভিন্ন দেশে নির্ভুল লক্ষ্যভেদ ও মুক্তির স্লোগান দিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার ফলাফল ছিল অত্যন্ত করুণ। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্টের তথ্যমতে, সরাসরি যুদ্ধবিগ্রহে ৯ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৪ লাখ ৩২ হাজারের বেশি ছিল সাধারণ বেসামরিক নাগরিক। পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার কারণে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৪৭ লাখে গিয়ে ঠেকেছে। ইরাক যুদ্ধের উদাহরণ টেনে সমালোচকরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা বলে যে যুদ্ধ শুরু হয়, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর ধ্বংসলীলা ছাড়া আর কিছুই রেখে যায় না। ইরাক বডি কাউন্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেখানে ২ লাখেরও বেশি বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে যুদ্ধ কখনোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য কোনো সরঞ্জাম নয়।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটেও পাহলভির এই দাবি চরম বিতর্কিত। জাতিসংঘ সনদে স্পষ্টভাবে কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাহলভি যখন সামরিক শক্তিকে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান, তখন তিনি মূলত বৈশ্বিক এক বিপজ্জনক নীতিকেই সমর্থন দিচ্ছেন। এই ধরনের অবস্থান ইরান রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করার সুযোগ করে দেয়, যেখানে যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হয়। এতে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হয় এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি সাধারণত কোনো পরিচ্ছন্ন গণতান্ত্রিক পথ তৈরি করে না বরং এটি জরুরি অবস্থা, মিলিশিয়া রাজনীতি, প্রতিশোধের সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ধসের জন্ম দেয়। যারা সত্যিকার অর্থে ইরানের একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ চান, তাদের উচিত বোমা বা মিসাইলের বদলে নাগরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং অপরাধীদের কূটনৈতিক ও আইনিভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া। যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা আসার যে দাবি পাহলভি করছেন, তা মূলত গত দুই দশকের ব্যর্থ সামরিক রাজনীতিরই একটি পুনর্ব্যবহৃত রূপ।
সূত্র: মিডলইস্ট মনিটর



