কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন

বাংলাদেশ দূতাবাস, কাঠমান্ডুর আয়োজনে কাঠমান্ডুতে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ পালিত হয়েছে। দূতাবাস প্রাঙ্গণে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়, যার মধ্যে ছিল আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এসকল আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়।

উক্ত অনুষ্ঠানে কাঠমান্ডুভিত্তিক বিভিন্ন দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মিশনপ্রধান ও কূটনীতিকবৃন্দ, সার্ক সচিবালয়ের প্রতিনিধি, ICIMOD-এর কর্মকর্তাবৃন্দ, ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ, বাংলাদেশ বিমান নেপাল অফিসের কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশ ক্লাবের সদস্যবৃন্দ, নেপাল-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতি ও নেপাল চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিবৃন্দ, নেপালি ব্যবসায়ীবৃন্দ এবং নেপালে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই নেপালের কূটনৈতিক কোরের সদস্যবৃন্দ দূতাবাসে স্থাপিত শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। অনুষ্ঠানে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত বাণী পাঠ করা হয়। এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে ইউনেস্কো জেনারেল কনফারেন্স-এর সভাপতি কর্তৃক প্রদত্ত ভিডিও বার্তাও প্রদর্শিত হয়।

নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কর্তৃক প্রদত্ত স্বাগত বক্তব্যে তিনি ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আত্মোৎসর্গকারী ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও প্রসারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে মাতৃভাষাসহ বহুভাষাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। ভাষাকে সংযোগ স্থাপনের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধকারী মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করে তিনি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি এ বছরের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য-‌‘Youth voices on multilingual education’-এর প্রশংসা করেন এবং ভাষাগত বৈচিত্র্য প্রসারে প্রযুক্তির ব্যবহার ও পুনরুজ্জীবনে তরুণ প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নিশ্চিতকল্পে নেপাল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

নেপালে ইউনেস্কো কার্যালয়ের প্রধান বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন। পাশাপাশি ফিনল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও রাশিয়ার মিশনপ্রধানগণ, ভারতের উপ-মিশন প্রধান এবং ইউনিসেফের উপ-প্রতিনিধি যথাক্রমে তাদের মাতৃভাষা-ফিনিশ, সিংহলি, মালয়, রাশিয়ান, হিন্দি ও কোরিয়ান ভাষায় বক্তব্য দেন।

এছাড়াও নেপালে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি এবং নেপাল ভাষা কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও বক্তব্য রাখেন। বক্তাগণ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনে বাংলাদেশের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকার প্রশংসা করেন। তারা মাতৃভাষাসহ বহুভাষিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেকসই শিক্ষা ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

আলোচনা পর্বের পর একটি বহুভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। এতে নেপালের তিনটি ভাষায় (নেপালি, নেওয়রি ও তামাং) এবং বাংলা ভাষায় সংগীত পরিবেশন করা হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে নেপালের ঐতিহ্যবাহী থারু নৃত্যও পরিবেশিত হয়। কাঠমান্ডুর একটি স্থানীয় বিদ্যালয়ের সহযোগিতায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে অতিথিবৃন্দ বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবার দ্বারা পরিবেশিত নৈশভোজ উপভোগ করেন।

আয়োজনের প্রথম পর্বে ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর প্রভাতফেরির মাধ্যমে দূতাবাসে স্থাপিত শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top