উদ্বোধনের দুই বছর পরও পূর্ণতা পায়নি

উদ্বোধনের দুই বছর পার হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়ক। দীর্ঘ ১৫ কিলোমিটারের এই উড়াল সড়কে নগরীর লালখানবাজার থেকে পতেঙ্গা উভয় প্রান্তে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু র‌্যাম্প না থাকায় মধ্যপথে উড়াল সড়কটিতে কোনো গাড়ি ওঠানামা করতে পারে না। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উড়াল সড়কে প্রতিদিন যান চলাচল করার কথা ছিল ৩৯ হাজার ৩৮৮টি। অথচ ওই বছর প্রতিদিন যান চলেছে মাত্র আট হাজার ১২১টি; যা প্রত্যাশার মাত্র ২০ শতাংশ। অনুসন্ধান বলছে, পাঁচ সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণেই দুই বছরেও র‌্যাম্প নির্মাণ শেষ করতে পারেনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। 

২০২৪ সালের আগস্টে শুরু হয় উড়াল সড়কটিতে পরীক্ষামূলক যান চলাচল। ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি পতেঙ্গা প্রান্তে টোল আদায়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যান চলাচল শুরু হয়। শুরুতে উড়াল সড়কে ওঠানামার জন্য ১৫টি র‌্যাম্প নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির মুখে ছয়টি র‌্যাম্প বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু বাকি ৯ র‌্যাম্প নির্মাণ করতে গিয়েও বিভিন্ন সংস্থার বাধার মুখে পড়ে সিডিএ। বর্তমানে শুধু টাইগারপাসে র‌্যাম্পের কাজ শেষ হলেও যান চলাচল শুরু করা যায়নি।  

তিন বছরেও খুঁটি সরায়নি পিডিবি
জিইসি মোড় থেকে ওঠার র‌্যাম্পে কাজ শুরু হলেও তিন পক্ষের বাধায় শেষ করা যাচ্ছে না। কারণ র‌্যাম্পটির মুখে পিডিবির খুঁটি রয়েছে। খুঁটি সরাতে ২০২২ সালের ৭ নভেম্বর সাত কোটি ২৪ লাখ টাকা পিডিবিকে দেয় সিডিএ। তিন বছর পার হলেও খুঁটি সরিয়ে নেয়নি পিডিবি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবি বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের (স্টেডিয়াম) নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, সিডিএর চাহিদা অনুযায়ী খুঁটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় বিদ্যুতের তার মাটির নিচে নেওয়ার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা ছিল সিডিএর। তারা সেটি করে না দেওয়ায় বাকি খুঁটি সরানো যায়নি। 
এ ছাড়া র‌্যাম্পটির ওয়াসার মোড়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার আরসিসির পিট আছে। এটি সরিয়ে নিতে গত বছরের ৩০ জুন তিন কোটি ১৭ লাখ টাকা ওয়াসাকে দেওয়া হয়। বারবার তাগাদাপত্র দিলেও পিটটি সরিয়ে নেয়নি ওয়াসা। চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, ‘শুধু পিট নয়, এখানে পাইপও সরাতে হবে। পাইপগুলো আনতে হবে বিদেশ থেকে। এটি জটিল কাজ। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চার মাসের সময় দেওয়া হয়েছে। আশা করছি নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে।’ 
জানা গেছে, র‌্যাম্পটিতে ওঠার মুখ নির্বিঘ্ন করতে ম্যানোলা হিলের পাদদেশ থেকে দোকানও উচ্ছেদ করতে হবে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেটাও করতে পারছে না সিডিএ।

আগ্রাবাদ ও টাইগারপাসে মেলেনি রেলওয়ের জায়গা
টাইগারপাসে উড়াল সড়ক থেকে নামার র‌্যাম্পের মুখে সংযোগ সড়ক সম্প্রসারণ ও আগ্রাবাদ থেকে ওঠার র‌্যাম্প নির্মাণ করতে ২০২৪ সালে ২১ মার্চ ১২ হাজার ৭৮৯ বর্গফুট জমি চাওয়া হয়। দুই বছর হতে চললেও এখনও জমি বুঝে পায়নি সিডিএ। ফলে আগ্রাবাদে র‌্যাম্প নির্মাণ শুরু করতে পারেনি। টাইগারপাসে র‌্যাম্পের কাজ শেষ হলেও যান চলাচল শুরু করা যায়নি। এ বিষয়ে রেলওয়ের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সিডিএকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে সরে যাবেন। এরপর জায়গাটি সিডিএকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

পুলিশ ফাঁড়িতে আটকা ফকিরহাটের র‌্যাম্প
ফকিরহাটে নামার র‌্যাম্পের মুখে সিএমপি বন্দর থানার ফাঁড়ি রয়েছে। কিন্তু সিএমপি ফাঁড়ির একতলা ভবনটি সরিয়ে না নেওয়ায় র‌্যাম্প নির্মাণকাজ শেষ করা যাচ্ছে না। সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি কয়েকদিন হয়েছে। এ বিষয়ে জেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চসিকের নালায় আটকা ইপিজেডের র‌্যাম্প
সিইপিজেডে ওঠানামার দুটি র‌্যাম্প। এতে সড়কের পাশের নালাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নগরের প্রধান সড়কও বেহাল। নালা সংস্কারে সিটি করপোরেশনকে গত বছরের জুনে তিন কোটি আট লাখ টাকা দিয়েছে সিডিএ। সাত মাস পার হতে চললেও নালা সংস্কার করেনি সিটি করপোরেশন। ফলে ইপিজেড এলাকার সড়কও সংস্কার করতে পারছে না সিডিএ; আটকে আছে র‌্যাম্প নির্মাণের কাজও। জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, সংস্কারের কাজটি করছে নৌবাহিনী। ইতোমধ্যে দাপ্তরিক সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু হবে।   

ক্ষতিপূরণে আটকে আছে কেইপিজেডের র‌্যাম্প
কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকায় ওঠার র‌্যাম্প নির্মাণ স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে পড়েছে। এখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে; দিতে হবে ক্ষতিপূরণও। কিন্তু প্রকল্পটির অর্থছাড় বন্ধ থাকায় এখনও ক্ষতিপূরণের তালিকা তৈরি করতে পারেনি সিডিএ। সংস্থার নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, অর্থ বরাদ্দ পেলে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিয়ে কাজ শুরু করা হবে। এ ছাড়া নিমতলায় ওঠানামার দুটি র‌্যাম্পে কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু টোল বক্স নির্মাণ না হওয়ায় সেটি চালু করা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, ‘প্রকল্প পাসের ব্যবস্থায় গলদ রয়েছে। যেনতেনভাবে প্রকল্প পাস করা হয়। পরে অংশীজনের বাধার মুখে পড়ে। প্রকল্প একনেকে যাওয়ার আগে সব সেবা সংস্থার সঙ্গে বসে যদি কোথায় কার লাইন আছে সেগুলো কীভাবে সরানো হবে তা নির্ধারণ করা হয়, তাহলে এ সমস্যা তৈরি হতো না।’ 
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম বলেন, ‘প্রকল্পটি যখন নেওয়া হয় তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে থাকা জটিলতা নিরসন করে দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top