ফরিদপুর-৪ আসন: যেন ‘পাথরে ফুল ফোঁটালেন’ বিএনপির বাবুল

আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) আসনে যেন ‘পাথরে ফুল ফোঁটালেন’ বিএনপির প্রার্থী ও জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ফরিদপুর জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট সরোয়ারজান মিয়া। এরপর পরবর্তী সব নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা জামানত হারান।

দীর্ঘ ৩০ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল। তাঁর এ অর্জনকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

স্থানীয়দের মতে, শহিদুল ইসলাম বাবুলের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, মানবিক ও কোমল আচরণই তাঁকে এ বিপুল বিজয় এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিন মন্ত্রীবঞ্চিত এ এলাকার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে মন্ত্রিসভায় দেখতে চাওয়ার দাবি তুলেছেন।

অতীত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়- ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সরোয়ারজান মিয়া ১৯ হাজার ১৮৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রউফ খান নবাব ২ হাজার ১৪৯ ভোট পেয়ে জামানত হারান। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আওলাদ আলী ১ হাজার ৫০৩ ভোট পেয়ে জামানত হারান। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শাহ আলম রেজা ৩ হাজার ৯৩৭ ভোট পেয়ে জামানত হারান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম সাড়ে ১২ হাজার ভোট পেয়ে জামানত হারান। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি অংশ নিয়ে চারবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও এ আসনে প্রতিবারই জামানত হারায়। সেই ধারাবাহিক ব্যর্থতার অবসান ঘটিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিশাল সাফল্য এনে দেন শহিদুল ইসলাম বাবুল।

শহিদুল ইসলাম বাবুল ফরিদপুর-৪ আসনে নবাগত হিসেবে পরিচিত। তাঁর বাড়ি ফরিদপুর-২ আসনের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের কোনাগ্রামে। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হন। বর্তমানে তিনি জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি মূলত ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা) আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সারাদেশের প্রতিটি আসনে দুইজন করে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। ওই সময় ফরিদপুর-২ আসন থেকে শামা ওবায়েদ ও শহিদুল ইসলাম বাবুল—দুজনই দলীয় মনোনয়ন পান এবং মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। পরবর্তীতে দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে শহিদুল ইসলাম বাবুল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি পুনরায় ফরিদপুর-২ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। এ সময় শামা ওবায়েদ ও শহিদুল ইসলাম বাবুলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। একই দলের দুই পক্ষের কর্মীদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে, যাতে এক ব্যক্তি নিহত হন।

পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে শহিদুল ইসলাম বাবুল ফরিদপুর-২ আসন ছেড়ে ফরিদপুর-৪ আসনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। নতুন এলাকায় এসেও দলীয় একাংশের বিরোধের মুখে পড়েন তিনি। তবে তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে অল্প সময়েই দলীয় বিরোধ মিটিয়ে ফেলেন।

পাশাপাশি ফরিদপুর-৪ আসনের তিন উপজেলার বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধি এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হন। অন্য নির্বাচনী এলাকার সন্তান হয়েও কয়েক মাসের মধ্যে নতুন এলাকায় জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর জেলার চারটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয় লাভ করেন তিনি। মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল পান ১ লাখ ২৭ হাজার ৪৪৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মাওলানা সরোয়ার হোসেন পান ৭৫ হাজার ৮০৫ ভোট। তিনি ৫১ হাজার ৬৮৩ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। ফরিদপুরের অন্য তিনটি আসনে এত বড় ব্যবধানে কেউ জয়ী হননি।

নির্বাচনের আগে একাধিক সভায় শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে এক বছর আগে এই আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে নির্বাচন করার জন্য পাঠিয়েছেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, দীর্ঘ ১৭ বছর লড়াই-সংগ্রাম করেছি, মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছি। এখন আমাকে আওয়ামী লীগের অধ্যুষিত এলাকায় আবার যুদ্ধ করতে পাঠাবেন?

নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি ভাঙ্গায় এসে তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আমি কৃষক পরিবারের সন্তান। শূন্য হাতে আপনাদের কাছে এসেছিলাম। আপনারা আমাকে উজাড় করে ভালোবাসা দিয়েছেন। আপনাদের সঙ্গে আমার আত্মার বন্ধন দৃঢ় হয়েছে। আমি আপনাদের পাশে শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও থাকব।

এ সময় তিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top