জামায়াতের বড় উত্থান, সর্বোচ্চ ভোট

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী দল দীর্ঘদিন ধরে জোট-নির্ভর রাজনীতিতে পরিচিত হয়ে এসেছে। তারা এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব শক্তির প্রদর্শন করেছে।৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হওয়া এই নির্বাচনে, জামায়াতের একক ভাবে ৬৮টি আসন জয় প্রাপ্ত হয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক। জোটগতভাবে এই সংখ্যা ৭৭ আসনে দাঁড়িয়েছে। ফলে সরকার গঠনের পর্যায়ে না পৌঁছালেও বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত।বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে এবং জোটগতভাবে ২১২টিতে জয় প্রাপ্ত হয়েছে। তবে ৬৮টি আসনে জামায়াতের একক জয় দলটির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। কারণ, ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করে পেয়েছিল ৩টি আসন।বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে ১৯৯১ সালে ১৭টি, ২০০১ সালে ১৫টি ও ২০০৮ সালে ২টি আসনে জয় প্রাপ্ত হয়েছিল জামায়াত। সেই তুলনায় এবারের ফল দলটির জন্য ঐতিহাসিক মোড়।

জামায়াত ১৭ বছর পরি নিজস্ব নেতৃত্বে জোট গড়েছে এবং বিএনপির বিরুদ্ধে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালাচ্ছে। জোটের প্রার্থী হারলেও ৭৭ আসনের প্রাপ্তি দেখে বিশ্লেষকরা জামায়াতের উত্থান মনাচ্ছে। ঢাকা মহানগরে ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জয় পেয়েছে জামায়াত, যারমধ্যে ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬ রয়েছে। আরও পাঁচটি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে, যেমন ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১৩ ও ১৭ আসনে। জামায়াত বা জোটের প্রার্থীদের কম ভোটের ব্যবধানে হারানোর কথা হয়েছে এই আসনগুলোতে। এছাড়াও, ঢাকা-১০ আসনে ৩ হাজার ৩০০ ভোটের ব্যবধানে আর ঢাকা-৭ আসনে ৬ হাজার ১৮৩ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। জামায়াত এবং জোটটি অনেক আসনে হারলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেলেছে।ফলাফলের ভৌগোলিক বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে যে, দেশের উত্তরাঞ্চলে—রংপুর এবং রাজশাহী বিভাগ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে—খুলনা বিভাগে জামায়াতের সাফল্যের মূল ক্ষেত্র। খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে, রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসনে জয় হাসিল করেছে।সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সব আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত দলের আঞ্চলিক প্রভাবে কার্যকর হয়েছে। রংপুর ও কুড়িগ্রামের সব আসন সমন্বিতভাবে জয়ী হওয়া স্বাভাবিক; এর মধ্যে দুটি আসন পেয়েছে শরিক এনসিপি।তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে বিএনপি অগ্রগতিতে আছে। ঢাকার ৭০টির মধ্যে ৮টি এবং চট্টগ্রামের ৫৮টির মধ্যে ৩টি আসনে জামায়াত এককভাবে জয় করেছে। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে কেবল জোটের শরিক খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে।

এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে – এমন আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্যকেও কেউ কেউ এর প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন।গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য বা জোটও একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।এই ক্ষেত্রে নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষক নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিমের পর্যবেক্ষণে কয়েকটি বিষয় এসেছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াত রক্ষণশীল ডানপন্থী পরিচয় থেকে মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং অনেকাংশে সফল হয়েছে। এত দিন বিএনপিকে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার ভোটগুলোর প্রধান জিম্মাদার মনে করা হতো। এই ক্ষেত্রে জামায়াতকে সহযোগী মনে করা হতো। এবার সেই ভোটে জামায়াত ভাগ বসাতে পেরেছে। এ ছাড়া দলটি নিজেদের ‘ক্ষমতামুখী নয়, পরিবর্তনের পক্ষে’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এর প্রভাবও তরুণদের মধ্যে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

জামায়াতের এই উত্থান নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট শাসন ছিল। যখনই গণতন্ত্র চাপা থাকে, মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হয়, তখন উগ্রবাদী শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে—সেটাই এ দেশে ঘটেছে। জামায়াতের যেটুকু উত্থান হয়েছে, তা আওয়ামী লীগের কারণেই হয়েছে। তাদের দমন-পীড়নমূলক শাসন, বিরোধী দলকে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না দেওয়া, নির্বাচন করতে না দেওয়ার কারণে এটা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top