মাহিন্দা রাজাপক্ষে—নায়ক থেকে খলনায়ক বনে যাওয়া এক নেতা

শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সর্বোত্কৃষ্ট নেতা মাহিন্দা রাজাপক্ষ। তিনি দেশে ২৬ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ শেষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আজকের শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও বিরোধীমত দমনের অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের আজকে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার চূড়া থেকে পতনের চূড়ান্ত সীমা দেখতে হয়েছিল তাঁকে।

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬

২০২২ সালে। দুই বছর ধরে চলতে থাকা করোনা মহামারির পর সমস্ত বিশ্বে মুক্তি হয়েছে, এবং অর্থনীতির চক্রটি আবার চলার সূচনা দেওয়া হয়েছে। তবে ভারত মহাসাগরের একটি ছোট দ্বীপদেশ, শ্রীলঙ্কা, এখন কালো মেঘে আচ্ছাদিত।বছরের শুরুতেই দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুত অনুপস্থিত, লোডশেডিং এড়ানো জনজীবনের মাধ্যমে চলছে; জ্বালানির জন্য ঘণ্টা পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেও তেল-গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না; দ্রব্যমূল্য আকাশ ছুঁয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশ নামিয়েছে।স্বাধীনতার পর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক সংকটে শ্রীলঙ্কা পড়েছে, এবং জনগণ দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য সরকারের দুর্নীতি ও অর্থিক অব্যবস্থাপনাকে দোষ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শ্রীলঙ্কার ক্ষমতার পরিচ্ছন্নতা এখন দুই ভাইয়ের হাতে।

বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপক্ষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেলেন, আর ছোট ভাই গোতাবায়া রাজাপক্ষ শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেলেন। বছরের শুরুটা থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রতি ছোট ছোট বিক্ষোভ ঘটতে থাকছে। এই বিক্ষোভগুলির কারণে গণবিক্ষোভ ৩১ মার্চ থেকে শুরু হল।সরকার বিক্ষোভের সম্মুখীন হতে চাইলেও বিক্ষোভকারীদের প্রতি কঠোর হয়েছে। প্রথম এপ্রিলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে এবং তারপরে ৩৬ ঘন্টার কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে। তাছাড়া, সেনা মোতায়িন করা হয়েছে কারফিউ প্রয়োজনে।সরকার প্রথমে বিক্ষোভ দমনে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পরে সমঝোতা সঞ্চালন করার চেষ্টা করেছিল। তবে, শেষে সমঝোতা সাধ্য হল না। গণআন্দোলনের তীব্র চেহারায় ৯ মে মাহিন্দা রাজাপক্ষের পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।মাহিন্দার পদত্যাগের ঘোষণার পরেও জনগণ নারাজ মন্ত্রিকে। বিক্ষোভকারীরা তাঁর বাড়িতে হামলা চালানোর চেষ্টা করে। রাতে সেনা পাহারায় সহপাঠীসহ কলম্বোর সরকারি বাসভবন ত্যাগ করলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষ।

ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কার জন্ম হয় ১৯৪৮ সালে। এর আগে থেকেই দেশটির রাজনীতিতে সুপরিচিত রাজাপক্ষে পরিবার। সামাজিকভাবে অভিজাত ওই পরিবারে ১৯৪৫ সালের ১৮ নভেম্বর জন্ম হয় মাহিন্দা রাজাপক্ষের। তাঁর বাবা ডন আলউইন রাজাপক্ষে।শ্রীলঙ্কার প্রথম পার্লামেন্টে রাজাপক্ষে পরিবারের যে দুই সদস্য ছিলেন, তাঁদের একজন মাহিন্দার বাবা। তিনি শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন, দুবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। শৈশব থেকেই পরিবারে রাজনৈতিক আবহ দেখে বড় হয়েছেন মাহিন্দা।১৯৭০ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে মাহিন্দা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে লেখাপড়া শেষ হয়নি তাঁর। পাঁচ বছর আগে বাবার ছেড়ে দেওয়া আসনে সেবার নির্বাচিত হয়েছিলেন মাহিন্দা।অবশ্য ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে মাহিন্দা হেরে যান এবং আইন পেশায় মনোযোগ দেন। ১৯৭৪ সালে মাহিন্দা কলম্বো ল কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।

শ্রীলঙ্কার প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম আসা মাভো বন্দরনাইক। 1994 সালে বন্দরনাইকের থেকে এসএলএফপির নেতৃত্ব চলে এসে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা। মাহিন্দা রাজাপক্ষি সহ নেতৃত্ব দায়িত্ব নিয়ে তিনি দুই দশক ধরে রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন।কুমারাতুঙ্গা কয়েকবার শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং মাহিন্দা রাজাপক্ষির মন্ত্রিসভা সদস্য হিসেবে কাজ করেছিলেন। 2005 সালে প্রেসিডেন্ট পদ অধিকার করার পর তার রাজনীতি থেকে অবসানে যান। কুমারাতুঙ্গা 2004 সালে মাহিন্দাকে তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top