চীনের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কায় জেলেদের বিতর্কিত দ্বীপ এড়াতে বললো জাপান

চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা যাতে আর না বাড়ে, সে লক্ষ্যে দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত বিতর্কিত সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের আশপাশের এলাকা থেকে নিজেদের জেলেদের দূরে থাকার অনুরোধ জানিয়েছে জাপান। বিশেষ করে যেসব জেলে নিয়মিত ওই জলসীমায় মাছ ধরতে যান, তাদেরকে আপাতত অঞ্চলটি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জাপানের ৭৬ বছর বয়সী জেলে হিতোশি নাকামা নিয়মিতই সেনকাকু দ্বীপের কাছে চীনা জাহাজগুলোকে এড়িয়ে মাছ ধরতে যান। তবে তিনি জানান, গত বছরের শেষ দিক থেকেই জাপানি কর্মকর্তারা গোপনে তাকেসহ অন্যান্য মৎস্যজীবীদেরকে ওই প্রত্যন্ত দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশের এলাকা এড়িয়ে চলতে বলছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই প্রথম জেলেদেরকে জাপানের এমন অনুরোধ জানানোর খবর প্রকাশ করেছে। জাপানের এই অবস্থানকে তাদের নীতির পরিবর্তন বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, এতদিন জাপান বিতর্কিত এলাকায় জেলেদের মাছ ধরাকে ওই অঞ্চলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করার একটি উপায় হিসেবে কাজে লাগিয়ে আসছিল।

সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ জাপান পরিচালিত হলেও চীনও এই দ্বীপ নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। বিষয়টি নিয়ে চীন ও জাপানের মধ্যে বহুদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছে। এর মধ্যে গতবছর নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর এক মন্তব্য ঘিরে দেশ দুটির সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ওই সময় বলেছিলেন, চীন যদি তাইওয়ানে আক্রমণ করে তবে টোকিও সামরিকভাবে তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে। তার এমন বক্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটে।

এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাকাইচিকে উত্তেজনা আর না বাড়ানোর অনুরোধ করেন। রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি যে, মৎস্যজীবীদেরকে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ থেকে দূরে থাকতে জাপান সাম্প্রতিক অনুরোধ জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির নির্দেশে নাকি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অনুরোধের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দ্বীপপুঞ্জটি জাপানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং চীনা অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে তারা বারবার কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।

মৎসজীবী হিতোশি নাকামা এবং ৫৩ বছর বয়সী কাজুশি কিনজো জানিয়েছেন, তারা গত নভেম্বরের শেষ দিকে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে কোস্ট গার্ড এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ফোন পান।

কিনজো বলেন, “তারা আগে কখনওই আমাকে এমন কিছু বলেনি।” এমনকি গতবছর ১৯ ডিসেম্বর জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা মৎসজীবী নাকামার সঙ্গে এক বৈঠকে মন্তব্য করেন যে, “ছোট ছোট ঘটনা অনেক সময় বড় আকার ধারণ করে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।”

নাকামা এই বক্তব্যকে ওই এলাকায় না যাওয়ার সরাসরি ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন। ইশিগাকির মেয়র ইয়োশিতাকা নাকায়ামা বলেন, জাপানি কর্মকর্তাদের উদ্বেগ, টান টান উত্তেজনার এই সময়ে কোনও জেলে চীন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক পারেন কিংবা তল্লাশির শিকার হতে পারেন- এমন ঝুঁকি আছে।

তিনি আরও বলেন, কোনও জাপানি মৎস্যজীবী যদি চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হন, তবে তা একটি বিশাল আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেবে। তাই জাপান সরকার এমন সংকট এড়াতে চাইছে বলেই তিনি মনে করেন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, কিছু ‘ডানপন্থি’ জাপানি মাছ ধরার নাম করে ওই এলাকায় উস্কানি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। চীনের দাবি, সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত।

জাপানি কোস্ট গার্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে যেখানে ১৮টি মাছ ধরার নৌকা ওই এলাকায় গিয়েছিল, ২০২৫ সালে তা কমে মাত্র ৮টিতে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টোকিও এখন একটি কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়েছে, মাছ ধরা বন্ধ করলে ওই এলাকায় চীনের প্রভাব বাড়বে, আবার মাছ ধরতে দিলে তা সরাসরি যুদ্ধের উস্কানি হিসেবে গণ্য হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top