চলচ্চিত্র শিল্পে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি বছর একুশে পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী-প্রযোজক ববিতা। তার এই প্রাপ্তিতে যেন হেসে উঠেছে ঝিমিয়ে পড়া পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গন। প্রায় সকলেই এমন খবরে স্বস্তি প্রকাশ করছেন।
বিপরীতে ববিতা যেন চুপচাপ। অপেক্ষায় আছেন রানারের! যে রানার একুশে পদকের রাষ্ট্রীয় চিঠিটি নিয়ে আসবেন তার দুয়ারে। তাইতো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই অভিনেত্রী সরল কণ্ঠে বললেন, ‘খবরটি শুনে ভালো লাগলো। এটুকুই।’
এরপর জানান, একুশে পদকপ্রাপ্তির খবরটি তিনি অফিসিয়ালি এখনও পাননি। এমন কোনও প্রজ্ঞাপনও তার চোখে পড়েনি। শুধু খবরে শুনেছেন তিনি পাচ্ছেন।
ববিতা বলেন, ‘অফিসিয়াল চিঠিটি পেয়ে নিই, তারপর একুশে পদক পেয়ে কেমন লাগছে সেটা জানাবো। তার আগে এ বিষয়ে কথা বলা ঠিক হবে বলে মনে করছি না।’
বলা দরকার, ববিতা ছাড়াও এ বছর একুশে পদক পাচ্ছেন চারুকলায় ডক্টর মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, স্থাপত্যে মেরিনা তাবাসসুম, সংগীতে আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর), ব্যান্ড মিউজিকের জন্য ওয়ারফেজ, নাট্যকলায় পালাকার ইসলাম উদ্দিন, সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান, শিক্ষায় মাহবুবুল আলম মজুমদার, ভাস্কর্যে তেজস হালদার ও নৃত্যকলায় অথৈ আহমেদ।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ১টি ব্যান্ডকে ২০২৬ সালের একুশে পদকের জন্য মনোনীত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
ববিতার একুশে পদকের খবরে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান দীর্ঘ এক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সোশ্যাল হ্যান্ডেলে। যেখানে উঠে এসেছে অভিনেত্রীর জীবনের প্রায় পুরোটা-
১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই বাগেরহাটে ববিতার জন্ম। ডাক নাম পপি। প্রকৃত নাম ফরিদা আক্তার। তার বাবা নাজিমুদ্দিন আতায়ুব ছিলেন একজন সরকারি চাকরিজীবী। ববিতার জন্মের সময় তিনি চাকরি করতেন বাগেরহাটে। তাদের বাড়ি যশোরে। সেখানেই ছয় ভাই-বোনের সঙ্গে বড় হয়েছেন ববিতা। তার আরও একটি বোন ছিল। নাম ছিল জেলি। ভাই বোনদের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। জেলি মাত্র তিন বছর বয়সে অসুখে মারা যায়। ববিতার মা জাহানারা বেগম তখন সংসার সামলে হোমিওপ্যাথি পড়েন। তিনি কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে পড়াশোনা করেছেন। মেয়ের অকাল মৃত্যুর পর তিনি বিনা পয়সায় গ্রামের অসহায় মানুষদের চিকিৎসা করতেন। মায়ের ইচ্ছে ছিল ববিতা বড় হয়ে চিকিৎসক হবেন। কিন্তু অল্প বয়সেই তার পথ বেঁকে গেলো অন্যদিকে।
ববিতার বড় বোন সুচন্দা ততদিনে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হয়ে নাম কামিয়ে ফেলেছেন। যশোর ছেড়ে তাদের পরিবার চলে এসেছে ঢাকায়। তাদের বাড়িতে চলচ্চিত্রের মানুষদের আনাগোনা। সুচন্দার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে জহির রায়হানের। তিনি তখন মস্ত পরিচালক। জহির রায়হান একটি ছবি বানাবেন। ছবির নাম ‘সংসার’। ছবিতে রাজ্জাক ও সুচন্দার কিশোরী মেয়ের একটি চরিত্রের জন্য পরিচালক পছন্দ করলেন তার শ্যালিকা ‘পপি’কে। তিনি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। কিছুতেই অভিনয় করবেন না। কিন্তু বোন সুচন্দা আর মায়ের কথায় রাজি হয়ে গেলেন ববিতা।
তাদের মা খুব সংস্কৃতিমনা ছিলেন। নিজে কবিতা লিখতেন, আবার আবৃত্তিও করতেন। মা বলতেন, ‘শুধু পড়াশোনা করলেই চলবে না, পাশাপাশি নাচ জানতে হবে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি গাইতে জানতে হবে। পরিপূর্ণ মানুষ হতে হবে।’ মায়ের উৎসাহেই ববিতা চলে এলেন চলচ্চিত্রে। তখন তার নাম রাখা হলো ‘সুবর্ণা’, পপি থেকে হয়ে গেলেন সুবর্ণা। সামনে গিয়ে এই নামও বেশি দিন টিকলো না তার।
তবে এবার আর ‘সুবর্ণা’ নামে কাজ চললো না। তার নতুন নাম দেয়া হলো ‘ববিতা’। ‘জ্বলতে সুরুজকা নিচে’ ছবির শুটিং হবে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। কী একটা ঝামেলা হলো। ছবির কাজ গেলো পিছিয়ে। জহির রায়হানেরই আরেকটা ছবি ‘শেষ পর্যন্ত’-এ রাজ্জাকের নায়িকা করা হলো ববিতাকে। তিনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। দুদিন আগে যাকে ‘বাবা’ বলে ডেকেছেন তার নায়িকা কীভাবে হবেন? জহির শ্যালিকাকে দিলেন এক ধমক, ‘এ তো অভিনয়!’
ছবির কাজ সুন্দরভাবে শেষ হলো। ১৯৬৮ সালে মুক্তি পেলো ‘শেষ পর্যন্ত’। মুক্তির পর চারদিকে ববিতাকে নিয়ে হইচই পড়ে গেলো। ছবি করে যে টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন, তা দিয়ে গাড়ি কিনে ফেলেন ববিতা। সেই গাড়িতে মাকে চড়িয়ে, সিনেমা হলে গিয়ে ‘শেষ পর্যন্ত’ দেখতে চেয়েছিলেন। গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে মায়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু দেখতে পেলেন মায়ের নিথর দেহ। মেয়ের এত নাম-ডাক দেখে যেতে পারলেন না তার মা।
কিছু দিনের মধ্যে ববিতা অভিনয় করলেন ‘পিচঢালা পথ’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘স্বরলিপি’ ছবিগুলোতে। স্বাধীনতার কিছু দিন আগে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো তাকে দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা এনে দিলো। স্বাধীনতার পরপরই নিখোঁজ হলেন জহির রায়হান। ববিতা তার একজন অভিভাবককে হারিয়ে ফেললেও দমে গেলেন না। ১৯৭৩ সালে তিনি অভিনয় করলেন বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে। দেশ ছাড়িয়ে ববিতার প্রশংসা শুরু হলো দুনিয়াজুড়ে।
‘অশনি সংকেত’ বিশ্বের বহু মর্যাদাজনক চলচ্চিত্র উৎসবে গেলো, পুরস্কারও পেলো। বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে এবং শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে ‘বেস্ট ফিল্ম’ হিসেবে পুরস্কৃত হলো ‘অশনি সংকেত’। ছবির সঙ্গে সঙ্গে নানা দেশে গেলেন ববিতাও। ভিনদেশের দর্শকরা তার অভিনয়ে মুগ্ধ হলেন। এ তো সবে শুরু।
দেশেও ববিতা যে ছবিগুলোতে অভিনয় করলেন তার অনেকগুলো বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে যেতে লাগলো। তার ছবি নানা পুরস্কার পেতে লাগলো। তিনিও নানা পুরস্কারে ভূষিত হতে লাগলেন। তার ঝুলি ভরে উঠলো পুরস্কার আর প্রশংসায়। ববিতার ছবি মানেই প্রশংসা। ববিতা মানেই পুরস্কার।
দেশের বড় বড় পরিচালকদের প্রায় সবার ছবিতে তিনি কাজ করেছেন। জহির রায়হানের কথা তো বলা হয়েছেই। এহতেশাম, খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্ত, আমজাদ হোসেন, মিতা, ইবনে মিজানের মতো ডাকসাইটে পরিচালকদের অত্যন্ত পছন্দের অভিনেত্রী ছিলেন ববিতা। আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক, ফারুক, উজ্জ্বল, আনোয়ারা, রোজী, জাফর ইকবালের মতো গুণী অভিনয়শিল্পীরা ছিলেন তার সহকর্মী।
ভালো ছবির প্রতি ববিতার ছিল দুর্বলতা। ভালো ছবি হলে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে দিতেন। কখনও নামমাত্র পারিশ্রমিক নিতেন। ভালো ছবির জন্য যেকোনও ছাড় দিতেন। তখন প্রযোজকরা ববিতাকে তাদের ছবিতে পাওয়ার জন্য যেকোনও অঙ্কের পারিশ্রমিক দিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু তিনি গল্প পছন্দ না হলে ছবি করতেন না।
সেই সময় সিনেমা হলে তার ছবি দেখার জন্য দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। তার অভিনীত ‘নিশান’, ‘সোহাগ’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘দাবী’, ‘কথা দিলাম’, ‘দোস্তী’, ‘লায়লী মজনু’, ‘ওয়াদা’, ‘কথা দিলাম’ ইত্যাদি ছবি সুপারহিট হয়েছিল। যৌথ প্রযোজনার বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ‘দূরদেশ’, ‘মিস লংকা’, ‘আপোষ’ ইত্যাদি তার অভিনীত যৌথ প্রযোজনার ছবি। ‘মিস লংকা’ ছবিতে অভিনয় করে তিনি পাকিস্তানের সম্মানজনক ‘নিগার’ পুরস্কার পেয়েছিলেন।
২০১১ সালে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের অধিকার আদায়ের জন্য শুভেচ্ছাদূত নির্বাচিত হোন ববিতা। জাতিসংঘের আওতাভুক্ত দেশগুলোর মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং ব্যয় কমিয়ে তার কিছু অংশ সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের সাহায্যার্থে তহবিল সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছে ডিসট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফেন্টস ইন্টারন্যাশনাল (ডিসিআই)। এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংগঠন।
১৯৮৯ সালে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী অড্রেহেপবার্ন জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হওয়ার পর বাংলাদেশে এসেছিলেন। ববিতা তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, একজন জনপ্রিয় শিল্পী হয়ে মানবসেবা করতে কেমন লাগছে। উত্তরে হেপবার্ন বলেছিলেন, ‘একজন শিল্পীর শেষ বলে কোনও কথা নেই। তারা ক্যামেরার আড়ালে থেকেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের জন্য কাজ করে যেতে পারে।’ তখন থেকেই ববিতা উৎসুক ছিলেন যদি কখনও সেবা করার সুযোগ আসে তাহলে সে সুযোগটি কাজে লাগাবেন।
এখনও ঈদের দিনে, নিজের জন্মদিনে ববিতা তার বাসায় ডেকে নেন সুবিধাবঞ্চিত ছোট ছোট শিশুদের। তাদের সঙ্গে হেসে-খেলে বিশেষ দিনগুলো কাটান। তিনি ছেলেবেলাতেই চলে এসেছিলেন রুপালি জগতে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ করতে পারেননি। শুটিং-ডাবিং করতে করতে কখন যে জীবনের বেলা বয়ে গেছে, বলতেও পারবেন না। পর্দার বাইরে জীবনের নানা পাঠ নিতে এখন তিনি কৌতূহলী। আজকাল গাছের সঙ্গে, পাখির সঙ্গে, শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন বাংলাদেশের গৌরব, ববিতা।


