ওয়ারফেইজ: মঞ্চে ওঠার ৪ মিনিট আগে…

ইতিহাস গড়লো ওয়ারফেইজ! এটা অবশ্য খুব একটা যুতসই প্রশংসা হলো না। কারণ, বাংলা ভাষার ইতিহাসে টানা ৪০ বছর ধরে এখনও দারুণ জনপ্রিয়তা ও ব্যস্ততা নিয়ে টিকে আছে একমাত্র রক ব্যান্ড ওয়ারফেইজ। যে ইতিহাস ভবিষ্যৎ টপকাতে পারবে কি না, যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

ফলে এই ব্যান্ডটির সঙ্গে শুধু ‘ইতিহাস’ শব্দটি যোগ করলে আর হচ্ছে না। সঙ্গে ‘নতুন’ শব্দটিও গেঁথে দিতে হবে। বলতে হবে, দলটির ‘নতুন ইতিহাস’ হলো প্রথমবার কোনও ব্যান্ড রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক পেতে যাচ্ছে।

খবরে প্রকাশ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ওয়ারফেইজ ব্যান্ডকে ২০২৬ সালের একুশে পদকের জন্য মনোনীত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

যখন এই ঘোষণাটি হচ্ছিলো, তখন ​মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে তুমুল ব্যস্ত সময় পার করছিলেন ওয়ারফেইজ সদস্যরা। এদিন বিকালে ‘ওডোমো বাংলাদেশ টি-২০ কাপ ২০২৬’ উদ্বোধনী আসরের প্রধান চমক দিলো দলটির পরিবেশনা। সেটি পরিবেশন করবার জন্য মঞ্চে ওঠার ঠিক ৪ মিনিট আগে এই সুখবরটি খবরপত্রের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন স্টেজের পেছনে বসে! স্বাভাবিক, খবরটি তাদের কাছে ছিলো অবিশ্বাস্য কিংবা আরেকটি ইতিহাস গড়ার বিস্ময়।

দল প্রধান শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, ‘মঞ্চে ওঠার ঠিক ৪ মিনিট আগে আমরা খবরটি জানতে পারি। তখন আমরা ব্যস্ত ছিলেন মঞ্চে ওঠার জন্য। স্বাভাবিক খবরটি পেয়ে আমরা প্রত্যেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। নিজেদের সামলে নিয়ে দ্রুত মঞ্চে উঠলাম। সবার সঙ্গে খবরটি শেয়ার করলাম।’

টিপু তথা ওয়ারফেইজ সদস্যরা এই প্রাপ্তির পেছনে কৃতিত্ব দিতে চান দলেন শুরু থেকে প্রতিটি সদস্যকে। দলীয় ভাষায়, ‘ওয়ারফেজই প্রথম বাঙালি ব্যান্ড যারা এই পুরষ্কার পাচ্ছে। এই গৌরবের জন্য সকলের প্রতি চির কৃতজ্ঞ আমরা। বিশেষ করে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যান্ডটিকে সমর্থন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে সকল প্রাক্তন সদস্য এবং আমাদের সমস্ত পরিবার, বন্ধু, স্বজন। কারণ তাদের ভালোবাসা এবং সমর্থন ছাড়া আমরা এটি অর্জন করতে পারতাম না।’ 

ওয়ারফেইজের এই অর্জনকে সমগ্র বাংলা ব্যান্ড সংগীত সম্প্রদায় এবং শিল্পের জন্যও একটি মাইলফলক বলে মনে করছে দলটি।

বলা দরকার, ​১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া ওয়ারফেইজ মানেই হার্ড রকের বিস্ময়কর সব সৃষ্টি। যা বাংলাদেশের তখন থেকে এখনও এক বিস্ময়। কারণ, বাংলাদেশ তথা পুরো বাংলায় ব্যান্ড বা সংগীত মানেই সফট মেলোডি রক। সেই স্রোতের বিপরীতে ওয়ারফেইজ একাই যেন চার দশক ধরে হার্ড রকের পতাকা উঁচু করে ধরে রেখেছে। তাদের সৃষ্টি ‘বসে আছি’, ‘একটি ছেলে’, ‘অবাক ভালোবাসা’ কিংবা ‘ধূপছায়া’ আজও কিংবদন্তি হয়ে বাজে চারপাশে।

দলনেতা টিপু মনে করেন, ব্যান্ড হিসেবে প্রথমবার এই পদক পাওয়া কেবল ওয়ারফেইজের নয়, বরং পুরো ব্যান্ড মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির জয় হলো। এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

শুরুর দিকে ব্যান্ডটির ড্রামসে ছিলেন হেলাল এবং ভোকাল হিসেবে ছিলেন রাসেল। নব্বইয়ের দশক সঞ্জয়, কমল, টিপু ও বাবনা মিলে ওয়ারফেইজের সোনালি অধ্যায়ের শুরু করেন। তখন ‘অবাক ভালোবাসা’খ্যাত সঞ্জয়ের কণ্ঠ ব্যান্ডটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ২০০০-পরবর্তী সময়ে সঞ্জয় চলে যাওয়ার পর বালাম যুক্ত হন ভোকাল হিসেবে। তিনিও তুমুল তাল মিয়ে ব্যান্ডটিকে টেনে নেন। তারপর একই ধারায় বালামের পর হাল ধরেন মিজান। শেষ কয়েক বছর ধরে একই তালে যেন ব্যান্ডটিকে বাজিয়ে চলেছেন পলাশ। কারণ, পেছনে রয়েছেন ধীর-স্থির হাসিমুখ দলনেতা তুমুল ড্রামার শেখ মনিরুল আলম টিপু।

​টিপু স্পষ্টভাবে উল্লেখ করছেন, এই অর্জন কেবল বর্তমান সদস্যদের নয়। বরং ব্যান্ডের ফাউন্ডিং লাইনআপ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যত এক্স-মেম্বার ছিলেন, সবার অবদান এবং দর্শকদের অবিচ্ছিন্ন ভালোবাসাই আজ তাদের এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির চূড়ায় বসিয়েছে।

এই অর্জন প্রসঙ্গে বর্তমান ভোকাল পলাশ বলেছেন, ‌‌‘এটা আমাদের জন্য বিশাল একটি অর্জন। শব্দে আমার অনুভূতি প্রকাশ করা কঠিন। যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, সেই সব সিনিয়র ব্যান্ড সদস্যদের প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও কৃতিত্ব জানাই।’

সর্বশেষ ওয়ারফেইজ তাদের ৪০ বছরপূর্তি উৎসব করেছেন যুক্তরাষ্ট্র সফরের মাধ্যমে, ২০২৪ সালে। দুই মাসের এই সফরে তারা ডালাস, হিউস্টন, অস্টিন, মিনেসোটা, আটলান্টাসহ যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশ কয়েকটি রাজ্যে কনসার্ট করেছেন। সঙ্গে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে তাদের নতুন করে সাজানো পুরনো গান ‘অবাক ভালোবাসা’ রিমেকের মাধ্যমে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top