বিশ্বে মন্দা: যুক্তরাষ্ট্রে কমছে পোশাক কেনা, ব্যতিক্রম বাংলাদেশ

বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি আর ভোক্তা ব্যয়ের চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সারা দুনিয়া থেকে পোশাক কেনা কমিয়ে দিচ্ছে। বড় বাজার হিসেবে পরিচিত দেশটি ২০২৫ সালে আমদানির লাগাম টেনেছে প্রায় সব রফতানিকারক দেশের ক্ষেত্রেই। তবে এই সামগ্রিক মন্দার ভিড়েও একটি দেশ ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে পোশাক আমদানিতে কাটছাঁট করলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতি আস্থা ধরে রেখেছে। একইসঙ্গে বাড়িয়েছে ক্রয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দফতরের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর সময়ে বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মোট পোশাক আমদানি হয়েছে ৭১.৯০ বিলিয়ন ডলার—যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৪৪ শতাংশ কম।

শুধু মূল্যমান নয়, আমদানির প্রকৃত পরিমাণও (এসএমই হিসেবে) আরও বেশি হারে কমেছে, ৩.২৩ শতাংশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র কম সংখ্যক পোশাক কিনেছে। তবে এ সময় গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ১.৮৫ শতাংশ, যা বোঝায়—পরিমাণ কমলেও তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক আমদানি করা হয়েছে।

এই চিত্র যখন প্রায় সব প্রধান রফতানিকারক দেশের জন্যই নেতিবাচক, তখন বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্পষ্ট ব্যতিক্রম। বৈশ্বিক মন্দা ও আমদানি সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। বাস্তবতায়, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সারা দুনিয়া থেকে পোশাক কেনা কমিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকেই পোশাক কেনা বাড়িয়েছে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মূল্য প্রতিযোগিতা, বড় আকারের অর্ডার সামলানোর সক্ষমতা, সময়মতো ডেলিভারি এবং ক্রেতাদের আস্থাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক—এই চারটি বিষয়ই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করেছে।

বিশ্ববাজারে যখন অনিশ্চয়তা, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের এই ব্যতিক্রমী প্রবৃদ্ধি আবারও প্রমাণ করে—মন্দার মধ্যেও সঠিক কৌশল ও সক্ষমতা থাকলে বাজার ধরে রাখা যায়, এমনকি বাড়ানোও সম্ভব।

বাংলাদেশ থেকে আমদানি বেড়েছে ১২.৪৩ শতাংশ

২০২৫ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৬০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২.৪৩ শতাংশ বেশি। বিশ্ববাজারে সংকোচনের মধ্যে এমন প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য স্পষ্টভাবে ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

তবে মাসভিত্তিক চিত্রে কিছুটা চাপও দেখা যাচ্ছে। শুধু ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি হয়েছে ৫২৬.৫১ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের নভেম্বরের তুলনায় ১৪.৫৭ শতাংশ কম। অর্থাৎ বছরের শেষ প্রান্তিকে অর্ডার ও শিপমেন্টে ধীরগতির ইঙ্গিত মিলছে।

চীন থেকে আমদানিতে বড় ধস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার উত্থান

দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়েছে। জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে চীন থেকে আমদানি ৩৩.৯০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০.০৭ বিলিয়ন ডলারে।

অপরদিকে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি বেড়েছে ১১.৩৫ শতাংশ। ভারত: ৬.০৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, পাকিস্তান: ১১.৮২ শতাংশ বৃদ্ধি, ইন্দোনেশিয়া: ৯.৭৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও কম্বোডিয়া: সবচেয়ে বেশি, ২৬.১৮ শতাংশ বৃদ্ধি। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।

পিস হিসেবে আমদানিতে বাংলাদেশের বড় উল্লম্ফন

মূল্যমানের পাশাপাশি পিস বা পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের আমদানি পিস হিসেবে বেড়েছে ১৩.৩০ শতাংশ।

অন্যান্য দেশের অবস্থান—ভিয়েতনাম: ১১.৯৯ শতাংশ বৃদ্ধি, চীন: ২৫.৮৬ শতাংশ হ্রাস, ভারত: ৪.৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি, কম্বোডিয়া: ৩৫.৪০ শতাংশ (সবচেয়ে বেশি), পাকিস্তান: ১৮.২৮ শতাংশ ও ইন্দোনেশিয়া: ১৩.৩৯ শতাংশ। এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশ এখনও বাল্ক অর্ডার ও বড় পরিসরের উৎপাদনে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ধরে রেখেছে।

ইউনিট দামে চাপ, মার্জিন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা হলো—ইউনিট মূল্য বা প্রতি পিসের দাম। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ০.৭৭ শতাংশ কমেছে। অন্যান্য দেশের ইউনিট মূল্য পরিবর্তন—ভিয়েতনাম: ০.৫৭%, চীন: ১০.৮৪%, ভারত: +১.২৫% (একমাত্র বৃদ্ধি), কম্বোডিয়া: ৬.৮১%, পাকিস্তান: ৫.৪৬% ও ইন্দোনেশিয়া: ৩.১৮%।

এর অর্থ, অর্ডার বাড়লেও দাম কমিয়ে বাজার ধরে রাখার কৌশল নিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের  ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ সুদহার ও ভোক্তা ব্যয়ের সংকোচনের মধ্যেও বছরের শুরুতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে শক্ত অবস্থানে ছিল। তবে বছর শেষে বাংলাদেশও সেই অবস্থা ধরে রাখতে পারেনি। একইসঙ্গে ইউনিট মূল্য কমে যাওয়া, মাসভিত্তিক অর্ডার হ্রাস এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক বার্তা দিচ্ছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে শুধু পরিমাণ নয়—মূল্য সংযোজন, পণ্যের বৈচিত্র্য ও দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।’’

2 thoughts on “বিশ্বে মন্দা: যুক্তরাষ্ট্রে কমছে পোশাক কেনা, ব্যতিক্রম বাংলাদেশ”

  1. বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি আর ভোক্তা ব্যয়ের চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সারা দুনিয়া থেকে পোশাক কেনা কমিয়ে দিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top