আপডেট: ২১ মে ২০২৬
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে আবার একটি পুরাতন প্রশ্ন তুলেছে। সেই প্রশ্নটি হলো: চীন যদি তাইওয়ানে আক্রমণ করে, তাহলে কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের পাশে দাঁড়াবে?সন্দেহবাদীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে শুরু করে পশ্চিম গোলার্ধে বিভিন্ন সামরিক তৎপরতা—এই সমস্ত বিষয়ের মিশ্রণে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার তালিকায় তাইওয়ান ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে। ট্রাম্প নিজেও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, ‘সত্তর হাজার মাইল দূরে’ একটি যুদ্ধের জন্য আমেরিকানরা কেন লড়বে? এমনকি তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি সম্পর্কেও তিনি ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ধরনের বক্তব্য সি চিন পিংয়ের জন্য একধরনের সুবিধা তৈরি করে।
শুধুই ট্রাম্প যা বলছেন, সেটার দিকে তাকালে পুরো সত্য বোঝা যায় না। গত ১০ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাইওয়ানের সম্পর্ক অনেকটা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন এই সম্পর্ক কোনো এক সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না, বা দর-কষাকষির হাতিয়ার নয়। বরং এটি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে মার্কিন কংগ্রেস, সামরিক পরিকল্পনা, চিপশিল্প, অঙ্গরাজ্যগুলোর সহযোগিতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ দ্বারা তাইওয়ান গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
এই জটিল সম্পর্ক এতটাই বিস্তৃত যে কোনো মার্কিন প্রশাসনের পক্ষেই সহজে তা ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। একইভাবে, চীনের পক্ষেও এই বন্ধন দুর্বল করা কঠিন। একসময় বিশ্লেষকেরা রাষ্ট্রপতির প্রতিটি বক্তব্য খুঁটিয়ে দেখতেন তাইওয়ান নীতির ইঙ্গিত খোঁজার জন্য। এখন সেই যুগ প্রায় শেষ। উচ্চপর্যায়ের বক্তব্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সম্পর্কের স্থায়িত্ব এখন নির্ভর করছে প্রাতিষ্ঠানিক গতি ও গভীরতার ওপর।গত দুই বছরে তাইপে ও ওয়াশিংটনে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একই সময়ে চীন তাইওয়ানের ওপর নজিরবিহীন সামরিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তবু সম্পর্ক দুর্বল হয়নি, বরং আরও দৃঢ় হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল নিয়মিত তাইওয়ান সফর করছে, সাম্প্রতিক সময়ে সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির সদস্যরাও গিয়েছেন। অস্ত্র বিক্রিও অব্যাহত রয়েছে, এবং ট্রাম্প প্রশাসন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। নতুন আইন স্বাক্ষর করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও মজবুত করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে তাইওয়ান প্রণালিতে প্রতিরোধ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নতুন বাণিজ্যকাঠামোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে বেসরকারি খাতে। উন্নত চিপ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে তাইওয়ান এতটাই এগিয়ে যে এখন তাকে শুধু ঝামেলার জায়গা হিসেবে দেখা যায় না; বরং বিশ্ব অর্থনীতির খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। চীনের প্রভাব ছাড়া যে নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, সেটাও এখন বাস্তব, আর তার কেন্দ্রেই আছে তাইওয়ান।এর একটা উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় তাইওয়ানের চিপ কারখানা। শুধু এটুকুই নয়, তাইওয়ানের অনেক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার, ইলেকট্রনিকস আর উন্নত প্রযুক্তির খাতে বিনিয়োগ করছে। আবার আমেরিকার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও তাইওয়ানে কাজ বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর ক্লাউড প্রযুক্তিতে। দুই পক্ষই ধীরে ধীরে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে।
কংগ্রেস, প্রতিরক্ষা দপ্তর, অঙ্গরাজ্যের গভর্ণর, মেয়র, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি শিল্প—সবাই মিলে এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করছে। একই সঙ্গে, তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠানগুলোরও অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রণোদনা রয়েছে এই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। অতএব, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ এখন আর নির্ভর করছে না যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তার ওপর। বরং তা নির্ভর করছে, মুক্ত বিশ্বের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির ভেতরে তাইওয়ান কতটা গভীরভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারছে তার ওপর। চ্যানিং লি স্পেশাল কম্পিটিটিভ স্টাডিজ প্রজেক্টে গ্লোবাল পার্টনারশিপস-এর পরিচালক এবং ‘স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড’ পডকাস্টের সঞ্চালক। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট



