দিয়াগো গার্সিয়া নিয়ে নতুন যুদ্ধ, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য

ভারত মহাসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দিয়াগো গার্সিয়া নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছেন, দিয়াগো গার্সিয়ার সার্বভৌমত্ব মরিশাসের হাতে তুলে দিয়ে ১০০ বছরের ইজারা নেওয়া হবে স্টারমারের জন্য একটি বিরাট ভুল। ট্রাম্পের মতে, এই দ্বীপের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপস করা উচিত নয়, বিশেষ করে যখন ইরানের সাথে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, দেশগুলোর ক্ষেত্রে ইজারা কোনো ভালো সমাধান নয়। তিনি যুক্তি দেখান, মরিশাসের মতো একটি দেশের দাবি মেনে নিয়ে সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করা ব্রিটেনের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। ট্রাম্প সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দিয়াগো গার্সিয়া এবং যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি ব্যবহার করা অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।

কিয়ার স্টারমার ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় মরিশাসের কাছে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। চুক্তিতে বলা হয়েছে, সার্বভৌমত্ব মরিশাসের থাকলেও দিয়াগো গার্সিয়ার সামরিক ঘাঁটিটি দীর্ঘমেয়াদে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তবে ট্রাম্প এই ইজারা চুক্তির কঠোর সমালোচনা করে একে অত্যন্ত দুর্বল সিদ্ধান্ত এবং বড় বোকামি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

দিয়াগো গার্সিয়ার এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এল যখন লন্ডনের রাজনীতিতে পিটার ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে জেফরি এপস্টাইন কেলেঙ্কারি নিয়ে তোলপাড় চলছে। ম্যান্ডেলসনের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে নিজ দলেই প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই আক্রমণ স্টারমার সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভারত মহাসাগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত দিয়াগো গার্সিয়া স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই দূরপাল্লার বোমারু বিমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৫শ’ সামরিক কর্মী এবং সমসংখ্যক ঠিকাদার অবস্থান করছেন। ট্রাম্পের সমর্থকদের দাবি, বেইজিংঘেঁষা মরিশাসকে সার্বভৌমত্ব দেওয়া মানে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

১৯৬৫ সালে ব্রিটেন যখন চাগোস দ্বীপপুঞ্জকে মরিশাস থেকে আলাদা করেছিল, তখন প্রায় ২ হাজার আদিবাসীকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। যদিও ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক আদালত ব্রিটিশদের এই পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করে দ্বীপগুলো মরিশাসকে ফিরিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। তবে সমালোচকরা বলছেন, স্টারমার সরকার আদালতের এই পরামর্শ মেনে নিয়ে অতি-উদারপন্থা দেখাতে গিয়ে সামরিক স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগে এই চুক্তির সমর্থন জানালেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটিই বর্তমান প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক নীতি হিসেবে গণ্য করা হবে। এর ফলে দিয়াগো গার্সিয়া নিয়ে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ঐক্যে ফাটল ধরার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিশেষে, দিয়াগো গার্সিয়া কেবল একটি দ্বীপ নয়, এটি বিশ্বজুড়ে মার্কিন বিমান শক্তির প্রদর্শনের একটি প্রধান কেন্দ্র। ইরানের সাথে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প এই ঘাঁটিটি পুরোপুরি ব্রিটিশদের হাতেই দেখতে চান। ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান কি শেষ পর্যন্ত স্টারমারকে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে, নাকি এটি দুই দেশের সম্পর্কে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করবে, তা এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: নাইনটিন ফোরটি ফাইভ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top