গাজার ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ‘ফিলিস্তিনি আবাসন কমপ্লেক্স’ বানানোর পরিকল্পনা আরব আমিরাতের

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি এলাকায় হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনির জন্য একটি আবাসন কমপ্লেক্স নির্মাণ পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেছে।

পরিকল্পনাটি সম্পর্কে অবগত হওয়া একাধিক ব্যক্তির সূত্রে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, তারা এ সংক্রান্ত একটি খসড়া নকশাও দেখেছে।

ওই নকশা অনুযায়ী, রাফার কাছে এই ‘ইউএই টেম্পোরারি এমিরেটস হাউজিং কমপ্লেক্স’ নির্মাণ করা হবে। রাফায় একসময় প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বসবাস করতো, কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনীর অনবরত হামলার মুখে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহরটি এখন প্রায় জনমানবহীন।

হামাস-ইসরায়েল দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর জনবহুল উপকূলীয় ভূখণ্ডটিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে পরিকল্পনা করেছেন তাতে মিসর সীমান্তের কাছে অবস্থিত এ রাফা শহর থেকেই গাজার পুনর্গঠন শুরু হওয়ার কথা।

কিন্তু হামাস নিরস্ত্র হতে রাজি না হলে গাজায় ফের যুদ্ধ শুরু হতে পারে এই আশঙ্কায় দাতারা এই পুনর্গঠন পরিকল্পনায় অর্থ ঢালতে ইতস্তত বোধ করছে।

আমিরাতের এই প্রকল্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনেক কূটনীতিক সন্দিহান। তাদের মতে, হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকা ফিলিস্তিনিদের অনেকেই ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাস করতে রাজি নাও হতে পারেন।

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় গাজার জন্য দক্ষিণ ইসরায়েলভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন একটি বহুজাতিক মিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। তার মধ্যেই আমিরাতের কর্মকর্তারা এখন রাফাতে অস্থায়ী আবাসন কমপ্লেক্স নির্মাণ ও সেখানে মৌলিক সব সেবা দেওয়ার পরিকল্পনার বিস্তারিত শেয়ার করেছেন বলে জানিয়েছেন চার কূটনীতিক।

তাদের নকশা বলছে, আবাসন প্রকল্পটি হবে ইসরায়েল ও হামাস নির্ধারিত এলাকা বোঝাতে অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যে ‘হলুদ রেখা’ টানা হয়েছিল তার কাছাকাছি।

এ পরিকল্পনা সম্বন্ধে জানতে চাওয়া হলে আমিরাতের এক কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই না করে বলেছেন, “উপসগারের দেশগুলো গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তার মাত্রা বাড়াতে এখনও দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

বর্তমানে গাজার ২০ লাখ ফিলিস্তিনির প্রায় সবাই হামাস-শাসিত এলাকায় তাঁবুতে বা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এই আবাসন উদ্যোগ নিয়ে ওয়াশিংটন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর সঙ্গে সমন্বয় করছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আবাসন সুবিধা তৈরি করা হলে ফিলিস্তিনিরা হামাস-শাসিত অঞ্চল ছেড়ে আসতে উৎসাহিত হবেন। এতে হামাসকে বেসামরিকদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি তাদের নিরস্ত্র করার পথও প্রশস্ত হবে।

নিরাপত্তা বিষয়ক থিংক ট্যাংক ‘দ্য সুফান সেন্টার’-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ কেনেথ কাটজম্যান বলেন, এই ধরণের উদ্যোগের লক্ষ্য হলো হামাসকে ‘গলা টিপে ধরে’ পর্যায়ক্রমে ‘কাবু করা’।

“স্রেফ হাতেগোনা কয়েকটি আবাসন প্রকল্প দিয়ে হামাসকে হটানো যাবে না। তাদেরকে রুখতে হলে এমন আবাসন প্রকল্প লাগবে যেখানে কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি থাকতে পারবে,” বলেছেন তিনি।

২০২০ সালে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা আমিরাত সবসময়ই হামাস ও ওই অঞ্চলের অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি মনে করে।

ইসরায়েল এরই মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে শুরু করে রাফা পর্যন্ত বিশাল এলাকা খালি করে ফেলেছে আরব আমিরাতের প্রস্তাবিত আবাসনের মতো প্রকল্পগুলোর জন্য।

তবে এই আবাসন প্রকল্পগুলো গাজাকে স্থায়ীভাবে ‘ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নিয়ন্ত্রিত অংশ’ এমন বিভক্তির দিকে ঠেলে দেবে কি না তা নিয়ে অনেক কূটনীতিক প্রশ্নও তুলছেন।

রাফাসহ গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা এখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যার মধ্যে রাফা শহরটি অন্যতম। তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এলাকাতেই গাজার বিশাল জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবন যাপন করছে। ত্রাণকর্মীদের মতে, যেখানে মানুষের সংখ্যা বেশি সেখানেই মানবিক সহায়তা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা উচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top